Sunday, September 24, 2017
‘বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের প্রয়োজন নেই’ : নিউইয়র্কে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা মন্ত্রী

এনআরবি নিউজ, নিউইয়র্ক থেকে : ‘বাংলাদেশে চলমান উন্নয়ন পরিক্রমা কখনোই থেমে যাবে না। কারণ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক আগ্রহে সমগ্র প্রশাসন, পেশাজীবী, শ্রমজীবী, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সকলেই উন্নয়নের এই ধারায় সম্পৃক্ত হয়েছেন। রাজনৈতিক অঙ্গিকার হিসেবেই বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য তথা এসডিজি বাস্তবায়িত হবার ক্ষেত্র সুগম হয়েছে’-এমন আশাব্যঞ্জক তথ্য প্রকাশ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল।
বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার নিয়ে বিভিন্ন তথ্যের ব্যাপারে পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, ‘বৈধভাবে উপার্জিত অর্থ পাচারের কোন প্রয়োজন হবে না। ইচ্ছা করলেই তারা যে কোন দেশে যে কোন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারবেন। বিদেশীরা যেমন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছেন, একই প্রক্রিয়া রয়েছে বাংলাদেশীদের জন্যেও।’ ‘আমাদের সরকার আইন ঢেলে সাজিয়েছে। তাই আগে অর্থ পাচারের সুযোগ থাকলেও, এখন আর তেমন বেআইনী পথে যাবার প্রয়োজন হবে না।’ ‘প্রকল্পের বিপরীতে ব্যাংক থেকে বিপুল অংকের অর্থ ঋণ হিসেবে নিয়ে যারা প্রতারণা করেছেন, তাদের বিচার শুরু হয়েছে। কেউই রেহাই পাবে না’-উল্লেখ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী।
১৯ জুলাই বুধবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে ‘এসডিজির অগ্রগতি সম্পর্কিত জাতিসংঘের হাই লেভেল পলিটিক্যাল ফোরাম’-এ বাংলাদেশের ভ’মিকার আলোকে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, ‘এমডিজির সাফল্যের সিড়ি বেয়েই বাংলাদেশ এসডিজিতে অগ্রগতির পথে ধাবিত হচ্ছে। এমডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শুরু থেকেই বাংলাদেশ সরকার এসডিজি বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্টভাবে এবং লক্ষ্য স্থির করে কাজ শুরু করেছে।’
‘সামনের বছরের শেষে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ অথবা মহাজোট যদি জয়ী হতে না পারে, তাহলে এসডিজি তথা চলমান উন্নয়ন-অগ্রগতির এ ধারা থমকে দাঁড়াবে কিনা’-এনআরবি নিউজের এ সংবাদদাতার এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এসডিজির ১৭টি অভিষ্টের প্রায় সবগুলোকেই বাংলাদেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অংশে পরিণত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসডিজির প্রতিটি অভিষ্ঠকে সর্বসাধারণের মধ্যে এমনভাবে ছড়িয়ে দিয়েছেন যে, সমগ্র জনগোষ্ঠি আজ উন্নয়নের পক্ষে একাট্টা হয়েছে। উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত রাখার স্বার্থেই বাংলাদেশের মানুষ সামনের নির্বাচনেও তাদের সুচিন্তিত মতামতের সঠিক প্রতিফলনই ঘটাবেন।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক এই মুখ্য সচিব ও বর্তমানের মুখ্য সমন্বয়কারি আজাদ এ সময় উল্লেখ করেন, ‘১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে আহবান বিশ্বনেতাদের প্রতি রেখেছিলেন, ৪১ বছর পর অর্থাৎ ২০১৫ সালে প্রণীত ‘এসডিজি’ হচ্ছে সেই ভাষণের পরিপূরক। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে ছিল, ‘আসুন, সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এমন একটি বিশ্ব রচনা করি যা নির্মূল করবে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অবসান ঘটাবে যুদ্ধ এবং মানবিক বিপর্যয়; এবং মানবতার কল্যাণে বয়ে আনবে বিশ্ব শান্তি এবং নিরাপত্তা’ । আজাদ উল্লেখ করেন, ‘হাই লেভেল পলিটিক্যাল ফোরামে এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতির তথ্য বিস্তারিতভাবে উপস্থাপনের সময় সোনার বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধুর এই বক্তব্যকে উদ্ধৃত করেছি।’ ‘একইভাবে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আরেকটি বক্তব্যকেও জাতিসংঘ ফোরামে উদ্ধৃত করেছি। সেটি হচ্ছে, ‘আমি বিশ্বাস করি যে, যেভাবে এমডিজি অর্জন করেছে, ঠিক একইভাবে বাংলাদেশ এসডিজি অর্জনের সক্ষমতাও দেখাবে’ বলেন আজাদ।
সংবাদ সম্মেলনে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল করিম বলেন, ‘বাংলাদেশকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৫টি ভিশন, যথা: ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা, ২০৩০ সালে এসডিজি বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নয়নের মহাসড়কে উপনীত হওয়া, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়া, ২০৭১ সালে স্বাধীনতার শতবর্ষ পূর্তিতে বাংলাদেশকে উন্নয়নের বিস্ময়ে পরিণত করা এবং ২১০০ সালে ডেল্্টা প্লান বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিরাপদ ব-দ্বীপ হিসেবে গড়ে তোলার কার্যক্রমকে মূলত: এসডিজি বাস্তবায়নের পথে বড় একটি সহায়ক বলে বিবেচনা করা হচ্ছে’।
“দারিদ্র্য নির্মূল এবং পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা ” প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বা এসডিজি বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিষয়ক জাতিসংঘের ‘হাই লেভেল পলিটিক্যাল ফোরাম (এইচএলপিএফ)’ এর কার্যক্রম শুরু হয় গত ১০ জুলাই এবং ১৯ জুলাই বুধবার এটি শেষ হলো। বাংলাদেশের পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের নেতৃত্বে ২২ সদস্যের একটি বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল এ সম্মেলনে যোগদানের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে এ সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন। সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (প্রেস) নূরএলাহী মিনা।
এসডিজির অগ্রগতি কতটা হয়েছে সে ব্যাপারে স্বেচ্ছায় যে ৪৪টি দেশ প্রতিবেদন উপস্থাপনের অঙ্গিকার করেছিল, তারাই অংশ নেন এই ফোরামে।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘২০১৫ সালে এমডিজি বাস্তবায়ন শেষে জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রসমূহের জন্য এসডিজি প্রণয়ন করে। এমডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমডিজি বাস্তবায়নে তাঁর সরকারের সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘জাতিসংঘ এমডিজি অ্যাওয়ার্ড’সহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন।’ ‘সরকার এসডিজি’র সফল বাস্তবায়নের লক্ষে একজন “এসডিজি বাস্তবায়ন বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারী” নিয়োগ দিয়েছে যা বিশ্বের অনেক দেশেই নেই’-বলেন মন্ত্রী মুস্তফা কামাল।
পরিকল্পনা মন্ত্রী এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত এবং স্বল্পোন্নত থেকে উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলোর জন্য উদার আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। পাশাপাশি তিনি স্বল্পোন্নত দেশসমূহ এসডিজি বাস্তবায়নে যে সকল প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে এবং যে সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে তা তুলে ধরেন।
উন্নয়ন অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তারা যেন স্বল্পোন্নত দেশসমূহকে আর্থিক, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমান, টেকসই এবং সময়োপযোগী সহযোগিতা প্রদান করে। এলডিসি’র দেশগুলোতে ওডিএ (ঙউঅ), এফডিআই, এবং বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে উল্লেখ করে পরিকল্পনা মন্ত্রী এক্ষত্রে বিদ্যমান প্রতিশ্রুতিসমূহ পূরণের জন্য উন্নত দেশগুলোর প্রতি জোরালো আহ্বান জানান। এলডিসি’র দেশগুলোতে এসডিজির অভীষ্ট ও লক্ষ্যমাত্রাসমূহের পূর্ণ বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে মর্মেও মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
প্রবাসীদের প্রতি উদাত্ত আহবান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আগের অবস্থায় নেই বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রে যে শ্রম দিচ্ছেন, তা বাংলাদেশে দিলে একই মজুরি পাবেন, এ নিশ্চয়তা দিতে পারি। আর এভাবেই বাংলাদেশ সারাবিশ্বকে তাক লাগিয়ে উন্নতির পথে ধাবিত হচ্ছে।’
সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয় যে, ভিএনআর ও জেনারেল ডিবেটের পাশাপাশি বাংলাদেশ ছিল ৮টি সাইড ইভেন্টের আয়োজক। এসকল সাইড ইভেন্টে সহ-আয়োজক ছিল জার্মানী, নরওয়ে, ডেনমার্ক, ভিয়েতনাম, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ইথিওপিয়া, ঘানা, এস্তোনিয়া, কাজাখিস্তান,কানাডা, নেদারল্যান্ডস্, সিঙ্গাপুর, নেপাল। এছাড়া বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল এইচএলপিএফ-এর আরও ১৫টি সাইড ইভেন্টে অংশগ্রহণ করে।
জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন ১০ দিনব্যাপী এইচএলপিএফ এর এই অধিবেশনের সার্বিক সমন্বয় করেন। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে অন্যান্যদের সাথে আরও অংশ নেন পরিকল্পনা কমিশনের জেনারেল ইকোনোমিকস ডিভিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) এন এম জিয়াউল আলম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জিআইইউ এর মহাপরিচালক আবদুল হালিম। তারাও ছিলেন সংবাদ সম্মেলনে।

 

0 Comments

Leave a Comment

সব খবর (সব প্রকাশিত)

লক্ষ্য করুন

প্রবাসের আরো খবর কিংবা অন্য যে কোন খবর অথবা লেখালেখি ইত্যাদি খুঁজতে উপরে মেনুতে গিয়ে আপনার কাংখিত অংশে ক্লিক করুন। অথবা ‌উপরেরর মেনু'র সর্বডানে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন এবং আপনার খবর বা লেখার হেডিং এর একটি শব্দ ইউনিকোড ফন্টে টাইপ করে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ।