Sunday, November 19, 2017
প্রসঙ্গ : সৌদি শ্রমবাজার

মুহাম্মদ আনোয়ার শাহাদাত হোসেন : বাংলাদেশের অর্থনীতি অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। বৈদেশিক রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির ওপর এক বিরাট প্রভাব বিস্তার করে। দেশে অবস্থানরত লাখ-লাখ পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নির্ভর করে প্রবাসী শ্রমিকদের আয়ের ওপর। তাই দেশের অর্থনীতির গতি প্রবাহ ঠিক রাখতে হলে প্রবাসের রেমিট্যান্স প্রবাহও ঠিক রাখা চাই কিন্তু এই রেমিট্যান্স প্রবাহ সচল রাখতে হলে পৃথিবীর দেশে-দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জীবন ও কর্মসংস্থানের ব্যাপারেও দেশের সরকার এবং দায়িত্বশীল মন্ত্রণালয় বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর নিয়মিত ও কার্যকরী তদারকি বা পর্যবেক্ষণ জরুরি। যাতে করে যে কোনো দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর কোনো সমস্যা সৃষ্টি হলে তা দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ পূর্বক সমাধানের ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর বড় ধরনের সমস্যা নেমে আসে। অবৈধ শ্রমিকদের বৈধতার সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও দেশটিতে প্রচুর সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক এখনও অবৈধ রয়ে গেছে। যাদেরকে ধর-পাকড় করা হচ্ছে এবং সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে বাংলাদেশের শ্রমবাজার। মালয়েশিয়ার পর এবার একই অবস্থার সৃষ্টি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স স্রোতের অন্যতম সোর্স সৌদি শ্রমবাজারে। দেশটিতে বর্তমানে ‘এ নেশন উইদাউট ভায়োলেটর’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যার আওতায় আগামী ২৫ জুলাই ২০১৭-এ শেষ হতে যাওয়া সাধারণ ক্ষমার নির্ধারিত সময়ের পর অবৈধ সকল শ্রমিককে দেশে পাঠানো হবে এবং বিভিন্ন ধরনের প্যানাল্টিও রয়েছে। ইতিমধ্যেই সরকারি হিসেব মতে সৌদি আরব থেকে এই বিশেষ সুযোগের আওতায় প্রথম দফায় ২৬ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক এবং দ্বিতীয় দফায় ফিরেছেন আরও প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক। এখনও রয়ে গেছে হাজারও শ্রমিক। যাদের অনেকেই ফেরত যাবেন এবং অনেকে হয়তো থেকে যাবেন বা থেকে যেতে হবে সমূহ বিপদের ঝুঁকি নিয়ে। সৌদি আরব বাংলাদেশের অনেক বড় শ্রমবাজার। সরকারি হিসেব অনুযায়ী দেশটিতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ যাদের মধ্যে ৬০ হাজার নারী শ্রমিক রয়েছে। বেসরকারি হিসেবে এবং বাস্তবে দেশটিতে বাংলাদেশিদের সংখ্যা আরও অধিক হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই বিশাল সংখ্যক বাংলাদেশিদের মধ্যে অবৈধ শ্রমিকের সংখ্যাও কম নয় বরং বিপুল। সৌদি সরকারের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার বর্ধিত সময় ২৫ জুলাই’১৭-এর মধ্যে বিপুল সংখ্যক অবৈধ বাংলাদেশিদের বৈধ হওয়া বা দেশে ফেরত যাওয়া সহজ তো নয়ই বরং বেশ দুষ্কর! এমতাবস্থায় বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করে কোনো একটি সুন্দর সমাধানে পৌঁছার চেষ্টা করা যাতে করে বাংলাদেশি শ্রমিকরা যারা অবৈধ আছেন তারা যেন বৈধ হতে পারেন অথবা নিরাপদে দেশে ফিরে যেতে পারেন। বর্তমান সরকারের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক মোটামুটি ভালই বলতে হয় কেননা ৪৯টি মুসলিম দেশের সমন্বয়ে গঠিত জঙ্গি ও সন্ত্রাসবিরোধী সামরিক জোটে বাংলাদেশও যোগ দিয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস ও জঙ্গি বিরোধী অবস্থানে সৌদি আরবের সুরে বাংলাদেশও একাত্মতা ঘোষণা করেছে। সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের এই উষ্ণ সখ্যতার এই সময়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মন্ত্রী পর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে সৌদি সরকারের সাথে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা চালিয়ে গেলে হয়তো সুফল বয়ে আসতে পারে। অন্যথায় প্রচুর সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠানো হবে এবং জেল জরিমানারও শিকার হতে হবে। এমনিতেই দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি বৈধ শ্রমিকদের অবস্থা এখন তেমন ভালো নেই। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আইন বা বিধি-বিধানের কারণে অনেকেই চাকরি হারাচ্ছেন বা হারাবেন। প্রতিনিয়ত কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছে কর্মক্ষেত্র। তদুপরি দেশটির অর্থনৈতিক মন্দা প্রভাবের কারণেও বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের আয় রোজগারে বিরাট ধরনের প্রভাব পড়ছে যা পরোক্ষভাবে দেশের রেমিট্যান্সের ওপর প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে সৌদি আরবে অবস্থানরত নারী শ্রমিকদের অবস্থাও তেমন ভালো নয়। প্রতিনিয়ত কেউ না কেউ বিভিন্নভাবে প্রতারিত বা নির্যাতিত হয়ে কর্মস্থল থেকে পালিয়ে যাচ্ছে বা করুণভাবে দিনাতিপাত করছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা বা মার্কেটগুলোতে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে বিশেষ করে জুমার দিনে প্রতারিত নারী শ্রমিকদের ভিক্ষা করতে দেখা গেছে যা খুবই লজ্জা ও অপমানজনক। নারী শ্রমিকদের ব্যাপারে বাংলাদেশ দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ সরকারের আরও গভীর ও কার্যকর দৃষ্টি দেয়া জরুরি না হলে এই নারী শ্রমিকদের কারণে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিক তথা দেশের ভাবমূর্তি আরও নষ্ট হবে তাতে সন্দেহ নেই। আরও একটি বিষয় অত্যন্ত এলার্মিং সেটি হচ্ছে সৌদি আরবের ভিসা উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকে প্রচুর সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক প্রতিনিয়ত সৌদি আরব আসছেন জীবনের এক রঙিন স্বপ্ন নিয়ে অথচ কেউ জানেন না তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে! উভয় দেশের সরকারের পক্ষ থেকে নূন্যতম খরচের কথা বলা হলেও সর্বসাকূল্যে ৮-১০ লাখ টাকার নীচে কেউ সৌদি আরবে আসতে পারছেন না। কিন্তু সমস্যা হলো এই বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক যারা বিগত এক বছরের মধ্যে সৌদি আরব এসেছেন বা এখন আসছেন তাদের অবস্থা খুবই নাজুক। এদেশের নিয়মানুযায়ী যে ‘রেসিডেন্ট আইডেন্টিটি'(আকামা) পাওয়ার কথা তা নির্দিষ্ট সময়ে পাচ্ছেন না বা পেলেও চাকরি নেই, আবার অনেকেই এই আকামা পাচ্ছেন মাত্র ৩ মাসের জন্য অথচ তা নূন্যতম ১ বছরের পাওয়ার কথা। এই ৩ মাসের মধ্যে একজন শ্রমিক এদেশের ভাষা শিখে তারপর চাকরি খুঁজে নেয়া অত্যন্ত দুষ্কর ব্যাপার। যদি কেউ এই ৩ মাসের মধ্যে উপযুক্ত চাকরি যোগাড় করে তার স্পন্সরশিপ পরিবর্তন করতে না পারে তাহলে তাকে বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পরবর্তী ১ বছরের আকামা বানাতে হবে নতুবা আকামাহীন হয়ে অবৈধ অভিবাসীর তকমা নিয়ে প্রবাসে মানবেতর জীবন-যাপন করতে হবে। নতুন আসা অধিকাংশ শ্রমিকদের কপালে এখন এটিই জুটছে যা সৌদি দূতাবাস, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ভিসা ব্যবসায়ীরা দেখেও না দেখার ভান করে আছেন। আর অন্যদিকে জায়গা জমি বিক্রি করে জীবিকার তাগিদে আসা এসব শ্রমিকরা এখানে অসহায় জীবন বরণ করছেন। এটিই বাস্তব চিত্র! সৌদি আরবে শ্রমিক পাঠানোর ব্যাপারেও বর্তমানে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত এবং যারা স্ব-উদ্যোগে সৌদি আরব আসছেন তাদেরও সবকিছু ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এমতাবস্থায় সৌদি আরবের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা পূর্বক প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং সৌদি আরবস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস যৌথভাবে একটি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে সৌদি আরবের বিশাল শ্রম বাজার টিকিয়ে রাখার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমস্যা সমাধানের সম্ভব সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এটিই সৌদি প্রবাসীদের প্রত্যাশা।

মুহাম্মদ আনোয়ার শাহাদাত হোসেন : কলামিস্ট

0 Comments

Leave a Comment

সব খবর (সব প্রকাশিত)

লক্ষ্য করুন

প্রবাসের আরো খবর কিংবা অন্য যে কোন খবর অথবা লেখালেখি ইত্যাদি খুঁজতে উপরে মেনুতে গিয়ে আপনার কাংখিত অংশে ক্লিক করুন। অথবা ‌উপরেরর মেনু'র সর্বডানে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন এবং আপনার খবর বা লেখার হেডিং এর একটি শব্দ ইউনিকোড ফন্টে টাইপ করে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ।