Sunday, November 19, 2017
ভূয়ার যন্ত্রণা, আতঙ্কিত কমিউনিটি : সাঈদুর রহমান সাঈদ

বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছিল ১৯৭১ সনে এক রক্তক্ষয়ী ৯ মাসের স্বসস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে এবং যে যুদ্ধ ছিল বিশ্বের এক অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে এক নিরস্ত্র, সামরিক যুদ্ধ প্রনালীর সাথে একান্তই অনভিজ্ঞ, বাংগালী জাতীর স্বাধীনতা যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে বাংগালীরা বিজয় লাগ করতে পেরেছিল কারন তদানিন্তন আবাল বৃদ্ধ বনীতা, হিন্দু মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান জাতি ভেদাভেদ ভুলে গিয়েছিল, স্থান কাল পাত্র ভেদাভেদ ছিল না, জাতি তার নিজস্ব স্বকীয়তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ভুলে গিয়েছিল ধর্মীয় ভেদাভেদ।শুতকড়া ৯৭ জন বাংগালী প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ঝাপ দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে, আমরা বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী মুক্তিযোদ্ধারা এক পাত্রে ভাত খেয়েছি, একই বিছানায় ঘুমিয়েছি। সেই মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মই এখন দেশের শাসন ব্যবস্থায় এবং প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগে অধিষ্ঠিত, সমাজের বিভিন্ন কোনে কর্নধার হিসেবে অবস্থান করছেন। কিন্তু ৭১ এর সেই মন ও মানসিকতা কেন হারিয়ে গেল? কোথায় গেল সেই বাংগালীত্ব ও মনুষ্যতবোধ? এখানে সেখানে কেন এই হানাহানি? কেন পারছি না সেই ভ্রাতৃত্ববোধকে রক্ষা করতেকিংবা আবার জাগিয়ে তুলতে? তবে কি আমরা হারিয়ে ফেলেছি সেই বাংগালীত্ব, জাতীয়তা ও জাতীয়তাবোধকে? আমাদের প্রজন্ম বেচে থাকতেই যদি এত হানাহানি, এত রক্তক্ষয়, এত হিংসা বিদ্বেষ, তবে আমরা বিদায় নেয়ার পরে কি হবে আমাদের ভবিষ্যতপ্রজন্মের পরিনতি? সেই আতঙ্কে পুরো জাতিই আজ আতংকিত; এই না আবার কোত্থেকে কি হয়ে যায় !!!
দেশের মত এই প্রবাসেও নানা বিষয়ের ভূয়া পরিচিতিতে ভরে যাচ্ছে কমিউনিটি। একাত্তরের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিয়ে কেউ হয়ে যাচ্ছেন ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’, সমাজসেবা না করেও কেউ কেউ নামের আগে পদবী হিসাবে ব্যবহার করছেন ‘বিশিষ্ট সমাজসেবকে’ । আবার আরো একধাপ এগিয়ে কেউ কেউ অন্যের অধিকার ও অর্থহরণ করে হয়ে যাচ্ছেন ‘মহান মানবাধিকারকমী’। আবার আরেকদল বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাইক পেলে এমন এমন উপদেশ/নির্দেশদিয়ে যাচ্ছেন আমাদের মত সাধারন প্রবাসীদের যা তিনি বা তারা পারিবারিকভাবে কখনোই পালন করেন না। আর আরেকদল কিছু ভোট বানিয়ে ও কিছু ভোট বাগিয়ে গদি দখল করছেন বিভিন্ন সামাজিক ও সাংষ্কৃতিক সংগঠনের। পিতামহ ও পিতার একাত্তরের কলঙ্কজনক ভূমিকাকে ঢেকে দেয়ার জন্য কেউ কেউ অঢেল ডলার খরচ করে স্বাধীনতাপন্থীদের পাশে স্থান করে নেবার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আবার কেহ কেহ অন্য কাজ করেও নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন সাংবাদিক হিসেবে। সব মিলিয়ে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা, মেকী সমাজসেবক, ভুয়া উপদেশ প্রদানকারী, পিতামহের কলঙ্কমোচন প্রচেষ্টা পালনরত তথাকথিত সাংবাদিকরা বলতে গেলে অনেকটাই একজোট হয়ে কমিউনিটিতে বিচরণ করছেন যাতে আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে এরাই বুঝি এই কমিউনিটিতে তাদের ক্ষেত্রে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’।ঐ ভুয়ারাই আবার বিভিন্ন সংগঠনের জন্ম দিয়ে সেই সংগঠনের ব্যনার টানিয়ে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষন করার প্রয়াস চালাচ্ছেন। এমন ভূয়া ও ছদ্মবেশীদের উৎপাতে তাই সমাজের প্রকৃত ও যোগ্য সেবকেরা আজ কোণঠাসা কিংবা উহেলিত। তাদের নেই অঢেল অর্থ কিংবা বৈভব, না আছে সমাজকে নিয়ন্ত্রিত করার শক্তি।
বিজয়ের মাস গেল ডিসেম্বরে ‘ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাধারী’দের উৎপাতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা যেমন কোণঠাসা হয়ে ছিলেন তেমননি গত সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিউইয়র্কে অবস্থানকালে পেশায় নিয়োজিত সাংবাদিকরা ছিলেন সব অনুষ্ঠানে পেছনের সারিতে। হাফটাইম,-পার্টটাইম ও সামটাইম পত্রিকার সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফারদের ভীড়ে প্রকৃত পেশাজীবিদের পক্ষে দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়েছিল সেদিন। আর বিভিন্ন সামাজিক ও আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর যেকোন অনুষ্ঠানে স্বঘোষিত ‘বিশিষ্ট সমাজসেবক ও উপদেশদানকারীদের’ উৎপাতে সাধারন শ্রোতা ও দর্শকরা ত্যক্ত বিরক্ত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। প্রতিটি অনুষ্ঠানে শুধু সামনের সারির চেয়ার দখলইনয়, কিছুক্ষণ পর মাইক দখল করার মতলবে এরা তীর্থের কাকের মত বসে থাকেন। আর যখন সুযোগ পেয়ে যান তখন কেতাদূরস্ত ভাব নিয়ে এমন এমন উপদেশ দেন যা তারা কষ্মিনকালেও নিজের জীবনে প্রয়োগ করেন না। এরা অন্যের সন্তানদের কিভাবে মানুষ করতে হবে এবং কিভাবে কমিউনিটিকে সেবা করতে হবে তার নানা ফিরিস্তি দেন। কিন্তু নিজ নিজ সন্তানরা আমাদের এই কমিউনিটির ধারে কাছেওকেন আসতেচায় না তার কোন ব্যখ্যা তারা দেন না।
এরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট জোগাড় করে নকল পরিচয় গলায় ঝুলিয়ে বেড়ান আবার অন্যকে উপদেশ দেন সৎ জীবন যাপনের। এদের অনেকেই ব্যবসায় যুক্ত আছেন এবং তাদের কেহ কেহ ধর্মের লেবাস লাগিয়ে মানুষের মনে শ্রদ্ধা আদায় করার ভান ধরেন কিন্তু নিজের পরিবারে বা তার বাহ্যিক(!) জীবন যাপন প্রণালীতে ধর্ম চর্চ্চার তাগিদ অনুভব করেন না। কষ্ট হয়, করুনা হয় তাদের জন্য। দোয়া করি সৃষ্টিকর্তা তাদেরকে সুমতি দিক, সৎ পথে চলার তৌফিক দিক। জয় বাংলা।

লেখক:
সাঈদুর রহমান সাঈদ
মুক্তিযোদ্ধা বিমান সেনা
Sayed2345@gmail.com

0 Comments

Leave a Comment

সব খবর (সব প্রকাশিত)

লক্ষ্য করুন

প্রবাসের আরো খবর কিংবা অন্য যে কোন খবর অথবা লেখালেখি ইত্যাদি খুঁজতে উপরে মেনুতে গিয়ে আপনার কাংখিত অংশে ক্লিক করুন। অথবা ‌উপরেরর মেনু'র সর্বডানে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন এবং আপনার খবর বা লেখার হেডিং এর একটি শব্দ ইউনিকোড ফন্টে টাইপ করে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ।