Sunday, November 19, 2017

নিদারুণ দুঃখবোধের সাথে অসহায়ত্বের তীব্র এক মিশ্র অনুভুতি। মিযান এমন দুঃসহ অবস্থায় কখনো পড়েনি আর। কাজেই ওর করণীয় সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। আজ সন্ধ্যায় ও যা শুনেছে সেটা কি এ বাড়ির লোকজনকে বলা উচিৎ? সে ঠিক করতে পারছে না।

গত দুই ঘণ্টা যাবত সে উদ্ভ্রান্তের মত ঘুরেছে রিকশায় করে। অসহায়ত্বের সাথে যোগ হয়েছে বোনের সাথে অনাকাংখিত কথা কাটাকাটির যন্ত্রণাদায়ক চিন্তাটি। বোনের চেহারাও সে আর দেখতে চায়না বলে এসেছে রাগের মাথায়। অথচ ওদের পরিবারে ভাইবোনের যা সম্পর্ক, তা কি দুজনের একজন বেঁচে থাকতে ছিন্ন করার মত? দোষটি যারই হোক, মিযান নিজেকেই বারবার অপরাধী সাব্যস্ত করছে।

সেই কখন এক ফার্মেসিতে দাঁড়িয়ে প্যারাসিটামলের দুটো বড়ি কিনে পানি চেয়ে গিলে নিয়েছিল! মাথাব্যাথাটি এখনো যায়নি। পায়ের ওঠানামা থামিয়ে, পেছন ফিরে বিরক্ত মুখে রিকশাওয়ালা মাঝে মাঝেই জিজ্ঞেস করেছে, আপনি কি কোথাও যেতে চান, না শুধুই রিকশায় চড়ে বেড়াতে চান? কোন উত্তর না দিয়ে মিযান নিজের দুশ্চিন্তাতেই মগ্ন থেকেছে।

আজ যাকে নিয়ে মিযান উদবিঘ্ন, তিনি ওর বন্ধুর বড় ভাই। মিযান তাঁকে চেনে প্রায় চার বছর থেকে। দেখা হয়েছে বার চারেক। প্রতিবারই কথা হয়েছে সামান্য। সে বলেছে কম, শুনেছে বেশি। কিন্তু বন্ধুটির মধ্যস্ততায় দুজনই পরস্পর সম্পর্কে অনেক জানতো, এবং উচ্চাশা পোষণ করতো। সেই উচ্চাশা আজ পরাস্ত হয়েছে অবিমৃশ্যকারীতার কাছে। অরুণের কাছে শোনা কথাটি সত্য হলে সেই লোকের সাথে বাঁধন ছিন্ন হওয়ার কথা কয়েক ঘণ্টা পরে। একারণেই মিযান নিজেকে অপরাধী ভাবছে। আচ্ছা তিনি নিজে এক্ষণে কী ভাবছেন? এমন কি ভাবছেন যে মিযান এর কোন প্রতিকারের চেষ্টা করছে, অথবা কোন চেষ্টা করবে না? অথচ মিযান জানে যে এধরণের কাজ করার মত ব্যক্তিত্ব ওর নেই। ওর কথাকে কেউ আমলে নেবে না। বেড়াজালটি ছিন্ন করার কোন পথই সে দেখতে পাচ্ছে না। তাঁর স্ত্রী-কন্যা, ভাইবোন, এবং আত্মীয়-আপন-শুভাকাংখীর মতোই অতি ক্ষীণ হলেও মিযান তাঁর মাঝে আশার আলো দেখতো। আজ মনে হলো সেই আলোটি নিভে যেতে বসেছে।

প্রতিকারের কোনই পথ খুঁজে না পেয়ে মিযান সান্তনামূলক অন্য চিন্তা করতে লাগলো। লোকটির সাথে সম্পর্ক যদি ছিন্নই হয়, তাতে কার কতটুকু ক্ষতি হবে? মহৎ এবং হীন চিন্তা পোষণকারী কত লোকই তো প্রিয়জনের সাথে সম্পর্ক ছেদ করেছে! তাতে পৃথিবীর কার কী ক্ষতিবৃদ্ধি হয়েছে? ওর পরিচিত এক ব্যক্তির স্ত্রী কাউকে না জানিয়ে একটি শিশুকন্যাসহ স্বেচ্ছায় নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ কুড়ি বছর পর ফিরে এসে স্বামী এবং অপর কন্যার সংসারে পুণরায় সম্পৃক্ত হতে তো কারোরই কোন অসুবিধা হয়নি! পিতা পুত্রকে ত্যাজ্য করার ঘটনাতো কম বেশি সব সমাজেই ছিল এবং এখনো শোনা যায়!
আবার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অসময়ে মৃত্যু হলেও তো সংসার বা সমাজ অচল হয়ে যায় না! সাময়িক কান্নাকাটি এবং কয়েকটি লোকের জীবন ধারণে পরিবর্তন আসে মাত্র! তেমনিভাবে কখনো কখনো রাষ্ট্রনায়কের তিরোধান বা হত্যাকাণ্ডের ফলে দেশটি পথভ্রষ্ট হলেও ইতিহাসের বিচারে সে সময়টি ক্ষণকাল বৈ কিছু তো নয়! সময় সব দুঃখ ও কষ্টকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেয়। তাইতো বলা হয় ‘সময়ই সর্বোৎকৃষ্ট ডাক্তার’।

অরুণের মুখে শোনা কথাটি কারো সাথে সহভাগীতা করার মতো কেউ নেই আশেপাশে। নিজেকে বড় অসহায় লগছে মিযানের। সান্ত্বনা খুঁজতেই যেন সে রিকশাওয়ালাকে উত্তরের দিকে যেতে বললো। ঐ বাসায় সে আট মাস থেকে যায় নি। শেষবার যেদিন গিয়েছিল, তার ঠিক পরদিন এক ব্যক্তি ওর অপিসে এসে বলেছিল আপনি আর ঐ বাসায় যাবেন না। কারণ আপনি চলে আসার দুই মিনিটের মাঝেই বাসায় হানা দিয়েছিল। তা শুনে মিযান ভয় পেয়েছিল ভীষণ! সেই থেকে ঐ বাড়িতে আর যাওয়া হয়নি। আচ্ছা ঐ বাড়ির লোকজন কি আজকের কথাটি জানে?

যদি না জানে, তবে কথাটি জানানো কি ওর দায়িত্বের মাঝে পড়ে? অথবা কর্তব্য? অথবা বাধ্যবাধকতা? কথাটি জানালে এই পরিবারের কতটুকু উপকার হবে? ওরা কি কোন প্রতিকার করতে পারবে? অথবা উপকারের বদলে কতটুকু অপকার হবে? এই পরিবারের কাছে কি সে কোনভাবে ঋণী? বৃহত্তর এই পরিবারের একজন ওর নিকটবন্ধু, একথা সত্যি, এবং এবং সেই সুবাদে এবাড়ির অনেকেই ওর পরিচিত। চেহারায় না হোক অন্তত নামে পরিচিত।

বন্ধুটি এখন ধারেকাছে নেই। তাই একবার সে নিজেকে বন্ধুটির স্থানে দাঁড় করাচ্ছে। আর তখনি ব্যপারটি জানানো বা না জানানো সিদ্ধান্তহীনতার যন্ত্রণা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব চিন্তা করতে করতেই সময় চলে যাচ্ছে। অথচ এবাড়্রিতে বেশিক্ষণ থাকা ওর উচিৎ নয়। আজ সম্ভাবনা কম হলেও যে কোন সময় যে কোন অনর্থ ঘটতে পারে। শেষবার আসা দিনটির কথা মনে হলেই ওর সমস্ত চেতনা লোপ পেয়ে যায়। সেই সন্ধ্যায় সম্ভবত ওর উপস্থিতি টের পেয়েই অপরিচিত এক ব্যক্তি এসেছিল এবাড়িতে। সাথে থাথে সে লুকিয়েছিল খাটের নীচে। লোকটি অনেক জেরা করেছিল ভদ্রমহিলাকে। সেই লোক চলে যেতেই মহিলা বলেছিলেন লোকটি ওদের চর, আমার ভয় করছে, তুমি এক্ষুনি পালাও। মিযানও পথে নেমেছিল সাথে সাথে।

মনটি ওর বেশি ভাল ছিল না আজ এমনিতেই । তুচ্ছ একটি ঘটনা নিয়ে বড় বোনের সাথে কথা কাটকাটি করে বেরিয়ে এসেছিল বিকেলে। সন্ধ্যায় একা সে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছিল আলো থেকে অনেক দূরে, গাছের আবছা অন্ধকারে বসে। মাঝে মাঝে সিগ্রেটের ধোঁয়া ছাড়ার সাথে সাথে নিজের দোষটিও খণ্ডন করার চেষ্টা করছিল। ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মতো দোষটি প্রথমে ছোট মনে হলেও ধীরে ধীরে তা বড় হয়ে দেখা দিচ্ছিল। যতোই চেষ্টা করুক, অসহ্য যন্ত্রণা থেকে কিছুতেই সে নিস্তার পাচ্ছিল না।

ঠিক সেই সময় অরুণ এসে দাঁড়িয়েছিল অপরাধীর মতো। সে এমনিতেই খুব লম্বা এবং রোগাটে। মাথা নীচু করে দাঁড়ানোয় আলো আঁধারিতে ওকে আরো অদ্ভুত লাগছিল।

এক্ষণে কারো সান্নিধ্য চায় না মিযান। কিন্তু অরুণের দাঁড়ানোর ভঙ্গিটি দেখে বিচলিত হলো। বললো দাঁড়িয়ে কেন, বস! অরুণ না বসে এবং কোন কথা না বলে দাঁড়িয়েই রইলো। মিজান এবার সোজা হয়ে ওর মুখের দিকে ভাল করে তাকালো। দেখলো চেহারায় কাঁদ কাঁদ ভাব। মিযান নিজের দুঃখের কথা ভুলে গিয়ে বললো, কী হয়েছে, কাঁদছ কেন? মিনমিনে গলায় অরুণ কিছু বললো। বিরক্ত হয়ে মিযান কর্কশ স্বরে বললো, মিনমিন করছো কেন? ভণিতা ছেড়ে যা বলার জোরে বল! কথাগুলো বলে সে নিজেই আশ্চর্য হলো। অরুণের সাথে তো ওর সম্পর্ক অতি সম্ভ্রমের। পরক্ষণেই এই চিন্তাটিকে সে দূর করে দিল। আজ ওর মনটি একেবারেই ভাল নেই।

আবার কাঁদো কাঁদো হয়ে নিম্নস্বরে অরুণের উত্তর এলো, আজ তাঁর সাথে আমাদের সব সম্পর্ক শেষ হবে। মিজান প্রত্যুত্তরে বললো, কদিন আগেও এই কথা শুনেছিলাম। সবার মত আমিও বিচলিত হয়েছিলাম। সেদিনের মত আজকেরটাও যে গুজব নয় তার প্রমাণ কী? সে বললো, এই কিছুক্ষণ আগে এক ব্যক্তি এখানে এসে কান্নাকাটি করছিলেন। অন্যপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁকেই সাক্ষী থাকতে ও কাগজে সই করতে হবে। আমরা মনে করি কথাটি বিশ্বাসযোগ্য।

মিযান কোন উত্তর দেয়নি। অরুণকে আর বসতে বলেনি। কোন সমবেদনাও জানায়নি। কথাটিকে বিশ্বাস করবে কিনা ভাবতে ভাবতে চায়ের কাপে সশব্দে লম্বা লম্বা চুমুক দিয়ে গেল। পুরোটা সময় অরুণ আগের মতোই অপরাধীর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিল। মিযান হাত ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে হঠাৎ করেই চেয়ার ঠেলে দাঁড়িয়ে পড়লো। অরুণ বললো, কোথায় যাচ্ছ? মিযান হাঁটা শুরু করে ওর দিকে না তাকিয়েই বললো, জানি না।

রিকশা থেকে একসময় এই বাড়িতে এসে নামলো আট মাস পর। শেষবার বের হয়ে যাওয়ার সময় ওর গা ছমছম করছিল। আজ কেন জানি সে ভয় আর নেই। অথচ বাড়ির প্রায়ান্ধকার সিঁড়ির পেছনের খুপড়ির মত খোলা স্থানটিতে মানুষের অসংখ্য কালো কায়া। কোনটি খুব লম্বা, কোনটি খুব খাটো, কোনটি মোটা, কোনটি রোগা। কারো চেহারা দেখা যায় না, কিন্তু সবারই হাত পা বা দেহ নড়াচড়া করছে। সাথে অশরীরি ফিসফাস শব্দ। অস্বাভাবিক রকমের বড় কয়েকটি জোনাকির আলো ওপরে উঠে মুহূর্ত কয়েকের জন্য উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে নিস্প্রভ হতে হতে আবার নীচে নেমে যাচ্ছে। পরক্ষণে ওপর থেকে ছোট ছোট ধোঁয়ার কুণ্ডূলি উৎপন্ন হয়ে অন্ধকারকে ভুতুড়ে করে দিচ্ছে। তারপর আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে ওরা নরক বা স্বর্গে প্রবেশ করছে। দৃশ্যটি স্বাভাবিক অবস্থায় যে কারো মনে গা ছমছম করা অনুভুতি আনার কথা।

কিন্তু আজ মিজানের চেতনায় তা বিন্দুমাত্র ভয় বা কৌতুহল সৃষ্টি করলো না। ওর মনে আজ জীবনের কঠিনতম এক পরীক্ষা। এবাড়ির লোকজন যদি ইতোমধ্যেই কথাটি জেনে গিয়ে থাকে, তবে মিযান কীভাবে তাদের সম্মুখীন হবে? আর না জানলে সে কথাটি ওদের জানাবে কী বলে? জানালেই বা কী হবে? মীযানের ক্ষমতা কতটুকু? ভাগ্য বা বৃহত্তর কোন শক্তি যদি ওদের স্বার্থের বিপরীত কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তবে তা রদ করার শক্তি তো ওর নেই।

সিঁড়ির মুখে কেউ নেই। ফলে মিযান অনায়াসে ওপরে উঠে গেল। বাড়ির ভেতরে স্বাভাবিকের চেয়ে আজ লোকসংখ্যা অনেক বেশি। নারী ও শিশুদেরই চোখে পড়ছে।

ভেতরের ঘরে পা দিতেই এক ভদ্রমহিলা সামনে পড়লো। ঘরের স্বল্প আলোয় সে ঠিক চিনতে পারলো না। মহিলা পরক্ষণেই বলে উঠলো মিযান তুমি এখানে? গলার স্বর শুনে চিনতে পেরে মুখের দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠলো! এ কী চেহারা ও স্বাস্থ্য হয়েছে তার? শেষ দেখা চেহারার সাথে কত অমিল! মহিলা বলে চলেছে, কেউ তো আমাদের বাসায় আসে না আর! জান, খুব নিকট আত্মীয় স্বজনরাও আমাদের ত্যাগ করেছে। তা তুমি এতোদিন পর কী মনে করে এলে? তোমার সাহস তো কম নয়!

মিযান নিজেই জানে ওর সাহস কত! শেষবার ডানে বা বাঁয়ে কারো দিকে না তাকিয়ে, দুরু দুরু বক্ষে কিন্তু দৃষ্টিটি সামনে রেখে চলে গিয়েছিল। আর ফেরার নাম করে নি। তাই কথাটির কোন উত্তর দিল না। আজ এসেছে কীসের তাড়ণায় তা সে জানে না। ভদ্রমহিলা বললো আমি উত্তর দিক থেকে ফিরছি। শুনে এসেছি দশটা থেকে শহরে আঁধারের রক্ষকরা নেমে আসবে। এখন সাড়ে ন’টা বাজে। তুমি বেশিক্ষণ থেকো না এখানে। পারলে কাল সকালে আবার এসো।

মিযান আঁচ করতে চেষ্টা করলো সন্ধ্যায় অরুণ যা বলেছে, ভদ্রমহিলা তা জানে কি না। ‘কাল সকালে আবার এসো’ শব্দ কটি উচ্চারণের ভঙ্গি শুনে নিশ্চিন্ত হলো যে জানে না।

বাইরের ঘরে দুই ভদ্রলোক বসে আছেন পাশাপাশি। দুজনের গায়েই কালো কোট। মনের ক্লান্তি লাঘব করতেই যেন মিযান পাশের আরেকটি খালি চেয়ারে বসলো। দু পক্ষই পরস্পরের দিকে উৎসুক চোখে তাকালো। সে যেমন এবাড়ির সাথে দুজনের সম্পর্ক কী ভাবছিল, সেই দুজনও মিযান সম্পর্কে একই রকম ভাবছিল। কোন শব্দ উচ্চারণ না করে খুব শীঘ্র দু পক্ষই বুঝে নিল যে একটি দুঃসংবাদ নিয়ে ওরা সবাই খুব সন্ধিহান হয়ে আছে। এক কালো কোটধারীই প্রথমে নীরবতা ভাঙলো, খবর জানেন তো?

মিযান বললো, শুনেছি কিন্তু তা বিশ্বাসযোগ্য কিনা বুঝতে পারছি না।

অপরজন বললো, কথাটি সত্যি। আমরা তাঁকে এবং অপর পক্ষকে অনেক বুঝিয়েছি। কোন কাজ হয় নি। আজ বিকেলে কাজ শেষে আমাদের বিশ্রাম কক্ষে বসে থাকার সময় নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর পেয়েছি। আজ রাত চতুস্প্রহরে সব সম্পর্কের ইতি টানা হবে। কথাটি সত্যি।

মিযান বললো, নীচে অনেক কালো কায়া দেখে এলাম, এঁরা কি সবাই আপনাদের সাথের?

হ্যাঁ, মোট বাইশ জনের আমরা সবাই তাঁকে বুঝিয়েছি, ভূলোকে তার প্রয়োজন এখনো আছে, সলাপরামর্শ করেছি একসাথে।

এ বাড়ির কাউকে কথাটা জানিয়েছেন কি?

না, জানাই নি। কারণ জানানো উচিৎ হবে কি না, সে ব্যপারে আমাদের বাইশ জনের কেউই কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারছি না।

আমারও ঠিক সেই অবস্থা। সংবাদটি সত্যি হলে কেউ তা ফেরাতে পারবে না। অথচ তাঁর প্রিয়জনেরা দিশেহারা হয়ে আঁধারের মাঝে পথ হারিয়ে প্রেতাত্মা হয়ে যাবে। সংবাদটি সত্য না হলেও একই অবস্থা হবে। আবার এই পরিবারের এক প্রধান পুরুষ কয়েক ঘণ্টার মাঝেই সবার সাথে সম্পর্ক ছেদ করতে যাচ্ছেন কথাটি পরিবারের কাউকে না জানানোও আমার জন্য খুবই কষ্টকর একটি সময়। তাই নিজেকে খুব অপরাধী এবং একই সাথে অসহায় লাগছে।

আপনাকে কোন সান্ত্বনা বা পরামর্শ দেয়ার অবস্থা আমাদের নেই। কারণ আমরাও একই অবস্থার শিকার। একদিকে আপনার চেয়ে আমাদের অবস্থা বেশি খারাপ। কারণ প্রায় দেড় মাস ধরে চেষ্টা করে করে আমরা বিফল হয়েছি। অন্যদিকে একসাথে বাইশ জন আছি বলে আমরা একে অন্যের কষ্টটা বুঝি। কিন্তু আপনি একা। কষ্টটি আপনার একাই বহন করতে হবে। আপনাকে শুধু সহানুভুতিই জানাই।

বাজার থেকে কেনা কিছু জিনিস নিয়ে পরিবারের কর্তাটি ঘরে ফিরলেন। বিষাদ ক্লান্ত চেহারায় বললেন, অনেক দিন পর এলে। তিনিও অরুণের দেয়া সংবাদটি শোনেন নি বলে মনে হলো মিযানের কাছে। বললেন, সে তো ভীষণ অভিমানী, কারো কাছে দোষ স্বীকার বা ক্ষমা ভিক্ষা করবে না! আমরা জোর চেষ্টা চালাচ্ছি সিদ্ধান্তটির বিরুদ্ধে আবেদন করতে। শিল্পী মকবুলুর রহমান সমস্ত শিল্পী সমাজের সই জোগাড় করেছেন আজ। তুমি যদি কাল তোমার ওদিকটায় পেশাজীবিদের সই জোগাড়ের দায়িত্বটি নাও, তবে সবগুলো একসাথে করে আমরা তাঁর কাছে আবেদন করতে পারি।

মিযান মনে মনে ভাবলো, কাল পর্যন্ত যদি তিনি আমাদের সাথে থাকেন, তবে নিশ্চয়ই আমি তা করবো। কিন্তু চেহারায় বা দেহভঙ্গিতে কোন ভাবাবেগ প্রকাশ না করে বললো, আচ্ছা আমি তা করবো। কথাগুলো উচ্চারণ করেই সে চলে এসেছিল।

বিছানায় এপাশ ওপাশ করে সারারাত কেটে গেল। ভোরে পত্রিকা আসার সাড়া পেয়ে মিযান উঠে বসলো। পত্রিকার হেডলাইনে বড় বড় অক্ষরে লেখা, ‘পরাজিত নায়কের ফাঁসি কার্যকর’।

মিযান সকাল ছটায় আবার সেই বাড়িতে ফিরে এলো। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে এবং শোরগোল তুলে স্ত্রীপুরুষ সবাই তখন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। যাচ্ছে লাশের কাছে।

ঘরের ভেতর থেকে তখনো কয়েকটি কান্নার স্বর বেরিয়ে আসছিল। মিযানের পরিচয় পেয়ে এক বৃদ্ধ তাঁর কিশোরী দুই কন্যার নাম ধরে ডেকে বললেন কাঁদিস নে মা, এদিকে আয়, দেখ কে এসেছে।

দুর্বল পায়ে শরীরটি খাড়া রেখে মিযানের হাত দুটি ধরে বললেন বুঝলে বাবা, অন্যের ছেলেরা যখন মারা যায় তখন আমি কাঁদিনি। কিন্তু নিজের সন্তানের বেলায় চোখের জল আটকাতে পারছি না। তাই নিজেকে আজ খুব ছোট মনে হচ্ছে।

তাঁর কষ্টটি মিযানের দুঃখবোধকে আরো উসকে দিল।

 

১৫ই ডিসেম্বর, ১৯১৬

 

 

0 Comments

Leave a Comment

সব খবর (সব প্রকাশিত)

লক্ষ্য করুন

প্রবাসের আরো খবর কিংবা অন্য যে কোন খবর অথবা লেখালেখি ইত্যাদি খুঁজতে উপরে মেনুতে গিয়ে আপনার কাংখিত অংশে ক্লিক করুন। অথবা ‌উপরেরর মেনু'র সর্বডানে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন এবং আপনার খবর বা লেখার হেডিং এর একটি শব্দ ইউনিকোড ফন্টে টাইপ করে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ।