Sunday, November 19, 2017

‘বঙ্গবন্ধু দি গ্রেট’-এর ডাকে যুদ্ধে গেলাম- আজ থেকে ৪৬ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের ১ তারিখ ভারতের আসাম রাজ্যের দুর্গম পাহাড় ও গহীন অরণ্যে ঘেরা লোহারবন-এ গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্পে ইন্ডিয়ান আর্মি আমার স্যান্ডো গেঞ্জি পড়া এই ছবিটি তোলে এবং ইন্ডিয়ান শিখ সৈন্যরা নিজ হাতে আমার এই E-7667 সিরিয়াল নম্বরের ফরমটি ফিলাপ করে- তখন আমার বয়স ছিল ১৬ বছর- আমার প্রকৃত সার্টিফিকেট নাম মো. আবদুল ওয়াহিদ কিন্তু লেখালেখির জগতে ফারুক ওয়াহিদ নামেই পরিচিত। ঢাকার লেকসার্কাস কলাবাগান ছিল তখন লালবাগ থানার অধীন। এই ফরমে লেখা আছে identification marks: CUT ON RIGHT KNEE যা আমার ডান হাঁটুতে এখনো রয়েছে। ভারত সরকারের পাঠানো ৪৬ বছর আগের এই ছবিসহ ট্রেনিং ক্যাম্পের ফরমটি ভাগ্নি পুনমসহ ২০১৭-এর আগস্ট মাসে ঢাকা থেকে উদ্ধার করি- ছবিসহ ফরমটি প্রথমে দেখে শিহরিত হয়ে উঠি শরীর কাঁটা দিয়ে উঠে রোমাঞ্চিত হয়ে পড়ি। ইতিহাস কথা বলে- তাই এটা কি শুধু একটি মামুলি ছবিসহ ফরম না অন্য কিছু! একাত্তরে ভারত আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং দিয়েছে, অস্ত্র দিয়েছে, বস্ত্র দিয়েছে, অন্ন দিয়েছে এবং ভারতীয় ৯০ টাকা করে পকেট মানিও দিয়েছে(যদিও পড়ে জেনেছি টাকাটা মুজিবনগর সরকার দিয়েছে)। বিপদের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু- এখন বাংলাদেশের বন্ধুর অভাব নেই। ভারত একাত্তরে কী করেছে নতুন প্রজন্মের জন্য এই মুক্তিযুদ্ধের মহামূল্যবান দলিল বা নিদর্শনটি সচিত্র উল্লেখ করলাম।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় হানাদার পাকিস্তানি সামরিক সরকার ৩ আগস্ট ’৭১ রাষ্ট্রদ্রোহীতার অপরাধ এনে কোর্ট মার্শালে বঙ্গবন্ধুর বিচার করার ঘোষণা দেয়। কোটি কোটি বাঙালিসহ বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। আমাদের তখন পুরোদমে গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং চলছিল ভারতের আসাম রাজ্যের শিলচরের লোহার বন ট্রেনিং ক্যাম্পে এবং ট্রেনিংরত অবস্থায়ই আমাদের প্রশিক্ষক ভারতীয় শিখ সৈন্যরা বঙ্গবন্ধুর কোর্ট মার্শালের বিচারের থবরটি প্রথম দেন এবং এক পর্য্যায়ে তাঁরা কেঁদে ফেলেন এবং বঙ্গবন্ধুর জন্য প্রার্থনা করতে বললেন- শিখ সৈন্যরা বুঝে ফেলেছেন রাষ্ট্রদ্রোহীতার অপরাধে তথাকথিত কোর্ট মার্শালের প্রহসনমূলক রায় কি হবে। খবরটি পেয়ে আমরাও কেঁদে ফেলি- আমাদের অবস্থা দেখে আমাদের প্রশিক্ষক তথা শিখ সৈন্যরাই আবার ধমক দিয়ে কান্না থামিয়ে দেন- বলেন গেরিলা যোদ্ধাদের কাঁদতে নেই।
রক্তের আখরে লেখা বাঙালির ইতিহাসে হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক শোকাবহ ১৫ আগস্ট সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি শতাব্দীর মহাপুরুষ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মহান স্থপতি ও প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর মৃত্যু বার্ষিকীতে চিরঞ্জীব বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। “কাঁদো বাংলার মানুষ কাঁদো/যদি বাঙালি হও নিঃশব্দে কাছে এসো, আরো কাছে।” -শোকে মুহ্যমান বাঙালি জাতির সাথে কবি রবীন্দ্র গোপ কবিতার মাধ্যমে এভাবেই বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধার সাথে আবারো স্মরণ করছি।
আজ ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস- বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের এই মহান স্বাধীনতা দিবসে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি- যারা বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে একাত্তরে আমাদের আশ্রয় দিয়েছে(এক কোটি লোক), গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং দিয়েছে, অস্ত্র দিয়েছে, বস্ত্র দিয়েছে, অন্ন দিয়েছে- আরো অনেক কিছু করেছে ইতিহাস তার সাক্ষী।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা; ২ নং সেক্টর, বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

0 Comments

Leave a Comment

সব খবর (সব প্রকাশিত)

লক্ষ্য করুন

প্রবাসের আরো খবর কিংবা অন্য যে কোন খবর অথবা লেখালেখি ইত্যাদি খুঁজতে উপরে মেনুতে গিয়ে আপনার কাংখিত অংশে ক্লিক করুন। অথবা ‌উপরেরর মেনু'র সর্বডানে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন এবং আপনার খবর বা লেখার হেডিং এর একটি শব্দ ইউনিকোড ফন্টে টাইপ করে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ।