Nov 21, 2017

আজ সেই ভয়াল ও বিভীষিকাময় ২১ আগস্ট। বারুদ আর রক্তমাখা বীভৎস রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞের কলঙ্কময় দিন। ২০০৪ সালের এই দিনে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশের আয়োজন করেছিল আওয়ামী লীগ। আর ওই জনসভায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ওই সময় ক্ষমতাসীন চারদলীয় জোট সরকারের শীর্ষপর্যায়ের ইন্ধনে ওই হামলা চালায় জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি)। এতে দলটির মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভী রহমানসহ (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী) ২৪ জন নিহত হন। হামলা থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে নেতাকর্মীরা সেদিন মানবঢাল তৈরি করেন। এতে শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান।

সেদিনের সেই হামলায় আহত হওয়া পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীর অনেকেই ঘাতক গ্রেনেডের স্পি­ন্টারের দুর্বিষহ যন্ত্রণা নিয়েই ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। হাত-পা, চোখসহ দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারিয়ে অসংখ্য নেতাকর্মী পঙ্গু হয়ে অমানবিক জীবনযাপন করছেন। ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ হানিফ মাথায় বিঁধে থাকা স্পি­ন্টারের যন্ত্রণা ভোগ করে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যান।

বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকাকালে খোদ রাজধানীতে প্রকাশ্যে চালানো হয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভয়াল ও বীভৎস ওই হামলা। হামলার পর তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ‘জজ মিয়া’ নাটক সাজিয়ে ঘটনাটিকে ভিন্নদিকে নেয়ার অপতৎপরতা চালায়। তবে দ্বিতীয় দফায় অধিকতর তদন্তে বেরিয়ে আসে হামলার নেপথ্যের নীলনকশা। দ্বিতীয় দফায় চার্জ গঠন হয়েছে, সে-ও সাড়ে পাঁচ বছর হল। এতদিনেও শেষ হয়নি বিচার কাজ। এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে ওই ঘটনার মূল কুশীলবদের ১৮ জন।

আদালত ২২৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে বর্তমানে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের সাফাই সাক্ষ্য চলছে। আসামিপক্ষের ১১ জনের সাফাই সাক্ষ্য শেষ হয়েছে। আসামি শেখ আবদুস সালামের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য চলমান রয়েছে। আগামী ২২ ও ২৩ অক্টোবর এ মামলায় পরবর্তী সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে। এছাড়া ধার্য দিনে বিচারিক কার্যক্রমে আরও দু’জন আসামির পক্ষে ৬ জনের সাফাই সাক্ষ্য দেয়ার আবেদন রয়েছে। সব মিলিয়ে ন্যক্কারজনক এ গ্রেনেড হামলার বিচার কার্যক্রমে চলছে এক ধরনের দীর্ঘসূত্রতা।

জানতে চাইলে মামলায় রষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিনেও বিচার শেষ না হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। এর অন্যতম হল- তদন্তকালে ‘জজ মিয়া’ নাটক সাজিয়ে এ মামলাটি বিপথে নেয়ার চেষ্টা হয়েছিল।

একপর্যায়ে হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেডের উৎস, মজুদ, সংগ্রহ ও বিতরণ সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগপত্রে না থাকায় তা অধিকতর তদন্তের জন্য যায়। অধিকতর তদন্তে ১ বছর ১০ মাস ২৯ দিন লেগেছে। এরপর ২০১২ সালের ১৮ মার্চ দ্বিতীয় দফায় অভিযোগ গঠন করা হয়। প্রথম চার্জশিটে আসামি ছিল ২২ জন। অধিকতর তদন্তে আরও ৩০ জন যুক্ত হয়ে মোট আসামি হয়েছে ৫২ জন।

৪৯২ সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। এছাড়া আসামিপক্ষ মামলাটির বিচার কাজ বিলম্বিত করতে এ পর্যন্ত পাঁচবার উচ্চ আদালতে গেছে। এতে ২৯২ কার্যদিবস ব্যয় হয়েছে। আসামিপক্ষ সময়ক্ষেপণের জন্য অনেক সময় অপ্রাসঙ্গিক জেরাও করেছে। এতকিছুর পরও আমরা বিচার কাজের শেষ পর্যায়ে আসতে পেরেছি।

তদন্তের নামে প্রহসন : গ্রেনেড হামলার পর তৎকালীন জোট সরকার ঘটনা তদন্তে ২০০৪ সালের ২২ আগস্ট বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনকে চেয়ারম্যান করে এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে। ১ মাস ১০ দিনের মাথায় ১৬২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দিয়ে কমিশন বলে, সংগৃহীত তথ্যপ্রমাণ সন্দেহাতীতভাবে ইঙ্গিত করে, এ হামলার পেছনে একটি শক্তিশালী বিদেশি শক্তি জড়িত। তবে প্রতিবেদনে বিদেশি শক্তির নাম নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মতিঝিল থানায় তৎকালীন এসআই ফারুক হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত আবদুল জলিল ও সাবের হোসেন চৌধুরী পৃথক তিনটি মামলা করেন। পরে মামলার তদন্ত শুরু করে পুলিশ। হামলার দায় চাপানোর চেষ্টা করা হয় আওয়ামী লীগের ওপর। সাজানো হয় ‘জজ মিয়া’ নাটক। বিষয়টি ফাঁস হয়ে পড়ায় মামলার কার্যক্রম থেমে যায়।

পরে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়। ২০০৮ সালের ১১ জুন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন সিআইডি সিনিয়র এএসপি ফজলুল করিম। এতে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, হুজি নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়।

২০০৯ সালে মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মামলার অধিকতর তদন্ত শুরু হয়। ২০১০ সালের ৩ জুলাই বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব হারিছ চৌধুরী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ ৩০ জনকে নতুন আসামি করে মোট ৫২ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট দেন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ।

মামলার ৫২ আসামির মধ্যে মৃত্যুজনিত কারণে এখন আসামির সংখ্যা ৪৯ জন। এর মধ্যে বিএনপি নেতা তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, বিএনপির সাবেক এমপি কাজী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কায়কোবাদ, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হানিফ, ডিএমপির সাবেক ডিসি (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান, ডিএমপির সাবেক ডিসি (দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসান, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন, গ্রেনেড সরবরাহকারী মাওলানা তাজউদ্দিনসহ ১৮ জন আসামি পলাতক আছেন। তাদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে।

অন্যদিকে চাঞ্চল্যকর এ মামলায় গ্রেফতার হয়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সামরিক গোয়েন্দা অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক রেজ্জাকুল হায়দার, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক আবদুর রহিম, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ২২ জন আসামি কারাগারে রয়েছেন। যুদ্ধাপরাধসহ অন্য মামলায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান ও জেএমবির সদস্য শহিদুল আলম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় এখন ২২ আসামির বিচার চলছে।

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদমুক্ত দেশ গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একুশে আগস্টের শোককে শক্তিতে পরিণত করে সন্ত্রাস ও জঙ্গিমুক্ত একটি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে দেশের সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘একুশে আগস্টের হামলাকারী, পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা এবং মদদদাতাদের সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে দেশ থেকে হত্যা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের চির অবসান হবে। আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।’ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা দিবস উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে তিনি এ আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, এ হামলার মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, শান্তি ও উন্নয়নের ধারাকে স্তব্ধ করে দেয়া। বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করে হত্যা, ষড়যন্ত্র, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও দুঃশাসনকে চিরস্থায়ী করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করা।

1 Comment

সাঈদ, মুক্তিযোদ্ধা বিমানসেনা August 21, 2017 at 8:22 pm

71 এর পরাজিত দালালদের গাত্র দাহের কারন তাদের মনিবরা পরাজিত হয়েছিল বংগবন্ধুর সৈনিকদের কাছে তাই বংগবন্ধুকে হত্যা করা এবং তার ভবিষ্যত উত্তরসুরিদেরকে নিশ্চিহ্ন করাই ছিল এই হামলার উদ্দেশ্য। ১০৭১ সনেও কেহ কেহ (সামরিক এবং বেসামরিক) শ্লোগান তুলেছিল, যুদ্ধ করছি আমরা আর দেশ স্বাধীন হলে সরকার গঠন করবে আওয়ামী লীগ? তা হতে দেব না।” ঐ শ্লোগানের উদ্যোক্তাদেরকে ৭১ এর ৪/৫ মাস গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল। তখন যদি তাদেরকে ক্ষমা না করে ফাসিতে ঝোলানো হতো তবে আমার মনে হয় বংগবন্ধুকে এভাবে স্বপরিবারে মৃত্যুকে আলীংগন করতে হতো না। তাদের সকলের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

Leave a Comment

সব খবর (সব প্রকাশিত)

লক্ষ্য করুন

প্রবাসের আরো খবর কিংবা অন্য যে কোন খবর অথবা লেখালেখি ইত্যাদি খুঁজতে উপরে মেনুতে গিয়ে আপনার কাংখিত অংশে ক্লিক করুন। অথবা ‌উপরেরর মেনু'র সর্বডানে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন এবং আপনার খবর বা লেখার হেডিং এর একটি শব্দ ইউনিকোড ফন্টে টাইপ করে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ।