Sunday, September 24, 2017

বঙ্গবন্ধু এবং আবদুল জব্বার

হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী- ষাট ও সত্তর দশকের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী, বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত প্রিয় কণ্ঠশিল্পী, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক পাওয়া শিল্পী আবদুল জব্বার- ‘দুঃখের দহনে, করুন রোদনে, তিলে তিলে তার ক্ষয়’ হয়ে চিরদিনের জন্য আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন- আমাদের আর কোনোদিন গান শোনাবেন না। ৩০ আগস্ট বুধবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টা ২৭ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়ে ও সারা বাংলায় অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন- মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। আবদুল জব্বার ১৯৩৮ সালের ৭ নভেম্বর কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৫৬ সালে তিনি মেট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে গান গেয়ে রণাঙ্গনে যুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ও প্রেরণা যুগিয়েছিলেন। এই শিল্পীর গাওয়া ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ ও ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’সহ অংসখ্য গানে গানে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর গান শুনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা ও মনোবল বাড়িয়েছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে তিনি প্রখ্যাত ভারতীয় কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে মুম্বাইয়ের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশের ‍মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরিতে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও তখন ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গণসঙ্গীত পরিবেশন করেছেন যা ট্রেনিংরত মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। তিনি মুজিবনগর বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে সেসময় বিভিন্ন সময় গণসঙ্গীত গেয়ে প্রাপ্ত ১২ লাখ রুপি দান করেছিলেন।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক, ১৯৮০ সালে একুশে পদক ও ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করেন বাংলাদেশ সরকার। এছাড়াও ২০০৩ সালে বাচসাস পুরস্কার, ২০১১ সালে সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস(আজীবন সম্মাননা) এবং জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। তাঁর গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়?/ দুঃখের দহনে, করুন রোদনে,/ তিলে তিলে তার ক্ষয়!’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ ও ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ কালজয়ী গান তিনটি ২০০৬ সালে মার্চ মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত বিবিসি বাংলার শ্রোতাদের বিচারে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
আবদুল জব্বার ১৯৫৮ সাল থেকে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে পাকিস্তান বেতারে গান গাওয়া শুরু করেন। তিনি ১৯৬২ সালে প্রথম চলচ্চিত্রের জন্য গান করেন। ১৯৬৪ সাল থেকে তিনি বিটিভির নিয়মিত গায়ক হিসেবে পরিচিতি পান। ১৯৬৪ সালে জহির রায়হান পরিচালিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম রঙ্গিন চলচ্চিত্র ‘সংগমের’ গানে কণ্ঠ দেন। ১৯৬৮ সালে ‘এতটুকু আশা’ ছবিতে সত্য সাহার সুরে তার গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু’ গানটি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৬৮ সালে পীচ ঢালা পথ ছবিতে রবীন ঘোষের সুরে ‘পীচ ঢালা এই পথটারে ভালবেসেছি’ এবং ‘ঢেউয়ের পর ঢেউ’ ছবিতে রাজা হোসেন খানের সুরে ‘সুচরিতা যেওনাকো আর কিছুক্ষণ থাকো’, ‘এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি’ গানে কণ্ঠ দেন। ১৯৭৮ সালে সারেং বৌ চলচ্চিত্রে আলম খানের সুরে ‘ও রে নীল দরিয়া’ গানটি দর্শক জনপ্রিয়তা পায়। তার প্রথম মৌলিক গানের অ্যালবাম ‘কোথায় আমার নীল দরিয়া’ ২০১৭ সালে মুক্তি পায়। আব্দুল জব্বারের প্রথম স্ত্রী গীতিকার শাহীন জব্বার যার গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন আব্দুল জব্বার, সুবীর নন্দী, ফাতেমা তুজ জোহরার মত জনপ্রিয় বাংলাদেশি সঙ্গীতশিল্পীরা। তাদের সন্তান মিথুন জব্বারও একজন সঙ্গীতশিল্পী। জব্বারের দ্বিতীয় স্ত্রী রোকেয়া জব্বার মিতা যিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
এই কিংবদন্তি শিল্পী অসংখ্য চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন- যেগুলো অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং এখনও মানুষের মুখে মুখে। যেসব চলচ্চিত্রে গান গেয়েছিলেন- সংগম (১৯৬৪), নবাব সিরাজউদ্দৌলা (১৯৬৭), পীচ ঢালা পথ (১৯৬৮), এতটুকু আশা (১৯৬৮), ঢেউয়ের পর ঢেউ (১৯৬৮), ভানুমতি (১৯৬৯), ক খ গ ঘ ঙ (১৯৭০), দ্বীপ নেভে নাই (১৯৭০), বিনিময় (১৯৭০), জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০), নাচের পুতুল (১৯৭১), মানুষের মন (১৯৭২), স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা (১৯৭৩), ঝড়ের পাখি (১৯৭৩), আলোর মিছিল (১৯৭৪), মাস্তান (১৯৭৫), সূর্যগ্রহণ (১৯৭৬), তুফান (১৯৭৮), অঙ্গার (১৯৭৮), সারেং বৌ (১৯৭৮), সখী তুমি কার (১৯৮০), কলমিলতা (১৯৮১) এবং আরো অনেক ছবিতে অসংখ্য গান গেয়েছেন।
১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের তীর্থভূমি তাঁর ধানমন্ডি ৩২ নং রোডের বাড়িতে ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত এই তরুণ শিল্পী আবদুল জব্বারকে আটকিয়ে রেখেছিলেন- উদ্দেশ্য প্রতিদিন ধানমন্ডি ৩২ নং রোডের বাড়িতে শত শত মিছিল আসতো এবং বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য এবং শ্লোগান শেষ হলেই বলতেন ‘এই জব্বার লাগা’ বলার সাথে সাথেই জব্বারের ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’সহ অংসখ্য দেশাত্ববোধক জ্বালাময়ী গান গেয়ে মিছিলকারীদের উৎসাহ দিতেন এবং অনুপ্রাণিত করতেন। কিংবদন্তি শিল্পী বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত প্রিয় কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার এই দুঃখিনী বাংলায় শুধু একবারই আসেন শুধু একবারের জন্য- শিল্পীর গাওয়া ‘প্রতিদিন কত খবর আসে যে কাগজের পাতা ভরে’- কিন্তু আজ সেই দিনটি এসেছে শিল্পীর নিজের খবরই কাগজের পাতা ভরে।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা; ২ নং সেক্টর, বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

 

0 Comments

Leave a Comment

সব খবর (সব প্রকাশিত)

লক্ষ্য করুন

প্রবাসের আরো খবর কিংবা অন্য যে কোন খবর অথবা লেখালেখি ইত্যাদি খুঁজতে উপরে মেনুতে গিয়ে আপনার কাংখিত অংশে ক্লিক করুন। অথবা ‌উপরেরর মেনু'র সর্বডানে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন এবং আপনার খবর বা লেখার হেডিং এর একটি শব্দ ইউনিকোড ফন্টে টাইপ করে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ।