Nov 21, 2017

নিউইয়র্ক : ‘বঙ্গবন্ধু স্মারক বক্তৃতা’ উপস্থাপন করছেন ড. নজরুল ইসলাম। ছবি-এনআরবি নিউজ।

এনআরবি নিউজ, নিউইয়র্ক থেকে : ‘জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রকৃত বিচার এখনও হয়নি। যেটি হয়েছে, সেটিকে বলা যায় শেখ লুৎফর রহমানের পুত্র ব্যক্তি শেখ মুজিবের বিচার। কিন্তু জাতীয় নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার এখনও হয়নি। এজন্যে বৃহৎ আকারে তদন্ত হওয়া দরকার। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের নৃশংসতার নেপথ্যে কারা ছিল, কারা ষড়যন্ত্রে মদদ দিয়েছে, তাদের সকলের বিচার হওয়া দরকার। তাহলেই এমন ভয়ংকর বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হবে’-এমন অভিমত পোষণ করা হয় নিউইয়র্কে ‘বঙ্গবন্ধু স্মারক বক্তৃতা’ সমাবেশে। জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. নজরুল ইসলাম প্রদান করেন এই বক্তৃতা।
যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদের উদ্যোগে গত ৫ বছর যাবত এই ‘বঙ্গবন্ধু স্মারক বক্তৃতা’ হচ্ছে। এটি ছিল পঞ্চম বক্তৃতা। ৯ সেপ্টেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটসে ‘জুইশ সেন্টার’ মিলনায়তনে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রবাসীদের সমাবেশের শুরুতেই জাতিরজনক ‘বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব’ আলোকে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও গবেষণামূলক বক্তব্য উপস্থাপনের জন্যে ফুলেল শুভেচ্ছার মধ্য দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয় ড. নজরুলকে। শুভেচ্ছা জ্ঞাপনকারিদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ড. নূরন্নবী, সেক্রেটারি শিতাংশু গুহের সাথে ছিলেন খ্যাতনামা লেখক আনিসুল হক। শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেনের পুত্র ফাহিম রেজা নূর এবং সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের যুক্তরাষ্ট্র শাখার সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য শুভ রায়ও ছিলেন সেখানে।
ইউনিভার্সিটি অব মস্কো থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করার পর যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেন ড. নজরুল। স্মারক বক্তব্যের প্রারম্ভে তিনি বলেন, ‘১৯৮০ সালে মস্কোর থেকে বাংলাদেশে ফিরেই ‘জাসদ রাজনীতির নিকট বিশ্লেষণ’ নামক একটি গ্রন্থ লিখি, যা প্রকাশিত হয় ১৯৮১ সালে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নেপথ্যে জাসদের অবস্থান নিয়ে নানা গুঞ্জন রয়েছে, সে সব নিয়ে পর্যালোচনা, বিশ্লেষণ করেছি ঐ গ্রন্থে। অতি সম্প্রতি আমার আরেকটি বই প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সুশাসন নিয়ে। এর আগে ‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও বাংলাদেশের গ্রাম’ নামক আরেকটি গবেষণামূলক বই লিখেছি। আজকের বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের গ্রাম নিয়েই মূলত: আলোকপাত করবো।’
ড. নজরুল বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে পারলেই সত্যিকার অর্থে তাঁর প্রতি সম্মান জানানো সম্ভব। বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন। দুখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে চেয়েছিলেন।’ ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত জীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ পড়লে বাঙালি জাতির অবিস্মরণীয় এই নেতা সম্পর্কে অনেক কিছ্ইু জানা সম্ভব।’
বাঙালি জাতির মহান নেতার প্রতিটি কর্মে স্বচ্ছ্বতা ও জবাবদিহিতার আলোকে ড. নজরুল বলেন, ‘বিশ্বের অনেক বিখ্যাত মানুষই নিজের কাজে আর্থিক সোর্স প্রকাশ করেননি। বঙ্গবন্ধু ছিলেন তার ব্যতিক্রম। প্রতিটি আন্দোলনে কে কীভাবে সহায়তা দিয়েছেন, তা প্রকাশ করেছেন। সহকর্মীরাও যাতে তার মত স্বচ্ছ্ব থাকেন, সে জন্যেই তিনি এমন সরল ছিলেন।’
ড. নজরুল বলেন, ‘১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’র ডাক দিয়েছিলেন। এই কর্মসূচির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক, দুটি দিকই ছিল। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল যে নতুন কর্মসূচি বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, তা হলো প্রতিগ্রামে বাধ্যতামূলক সমবায় প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা এবং ক্ষমতার হাত বদল হওয়ায় দ্বিতীয় বিপ্লব আর অগ্রসর হতে পারেনি। ফলে সমবায়-গ্রাম প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন তা অবাস্তবায়িত থেকে যায়। তারপর চার দশকের বেশী সময় অতিবাহিত হয়েছে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনায় বহু পানি প্রবাহিত হয়েছে। বিশ্ব পরিস্থিতির নাটকিয় পরিবর্তন ঘটেছে। এত পরিবর্তনের পর আজো কী বঙ্গবন্ধুর সমবায়ী গ্রামের স্বপ্নের কোন প্রাসঙ্গিকতা এবং উপযোগিতা আছে? তাহলে তা কী? কীভাবে গ্রাম বিষয়ক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে যুগোপযোগী করে বাস্তবায়িত করা যেতে পারে?’
ড. নজরুল বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সমবায়ী গ্রামের প্রস্তাবে দুটি দিক ছিল। একটি হলো যৌথচাষ। বঙ্গবন্ধু প্রস্তাব করেছিলেন, গ্রামের সকল জমিতে যৌথ চাষ হবে। দ্বিতীয়টি ছিল, গ্রামের সকলকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি স্বয়ম্ভও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা। ‘গ্রাম তহবিল’ গঠন সংক্রান্ত বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে এই দিকটি বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।’
ড. নজরুল উল্লেখ করেন, ‘সমাজতন্ত্রের প্রতি বঙ্গবন্ধু তার নিজস্ব বিশ্বাস ও সে সময়কার সমাজতন্ত্রের আন্তর্জাতিক মডেল দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। যদিও বঙ্গবন্ধুর সমবায় পুরোপুরি সমাজতন্ত্রের সমবায় ছিল না। সমাজতন্ত্রের সমবায়ে সাধারণত: জমির ওপর ব্যক্তি মালিকানা থাকতো না, ফলে নীট উৎপাদনের প্রায় পুরোটাই শ্রমের ভিত্তিতে বিতরণ হতো। বিপরীতে, বঙ্গবন্ধুর সমবায়ে জমির ওপর ব্যক্তি মালিকানা অক্ষুন্ন ছিল। ফসলের ৩ ভাগ হওয়ার কথা ছিল। একভাগ জমির মালিকানা ভিত্তিতে, একভাগ শ্রমের ভিত্তিতে এবং আরেক ভাগ ‘গ্রাম তহবিল’র জন্যে। এই তহবিল দ্বারা গ্রামের কল্যাণমুখী বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হবার কথা।’
ড. নজরুল বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান গ্রাম সরকার চালু করেছিলেন। কিন্তু সেটি বিলুপ্ত করেছেন আরেক সেনাশাসক এরশাদ। এরপর খালেদা জিয়া এসে শুধু বাগাড়ম্বর করেছেন। কাজের কাজ কিছুই করেননি।’
‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা রচনায় আজকের প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে দরকার বঙ্গবন্ধুর জীবনী পাঠ করা। তাহলেই আধুনিক চিন্তা-চেতনার মানুষেরা গরিবী হঠানোর চলমান কার্যক্রমে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি অনুধাবনে সক্ষম হবেন’-মন্তব্য ড. নজরুলের।
আগের ‘বঙ্গবন্ধু স্মারক বক্তৃতা’য় অংশ নেন সাংবাদিক ও মানবাধিকার নেতা শাহরিয়ার কবীর, অধ্যাপক ড. মুনতাসির মামুন, টিভি ব্যক্তিত্ব বেলাল বেগ, কাজী সাজ্জাদ জহীর বীর প্রতিক।

 

0 Comments

Leave a Comment

সব খবর (সব প্রকাশিত)

লক্ষ্য করুন

প্রবাসের আরো খবর কিংবা অন্য যে কোন খবর অথবা লেখালেখি ইত্যাদি খুঁজতে উপরে মেনুতে গিয়ে আপনার কাংখিত অংশে ক্লিক করুন। অথবা ‌উপরেরর মেনু'র সর্বডানে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন এবং আপনার খবর বা লেখার হেডিং এর একটি শব্দ ইউনিকোড ফন্টে টাইপ করে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ।