Tuesday, October 17, 2017

জয়ন্ত আজ প্রায় ৬ বছর পর নিজের গ্রামের বাড়িতে আসছে। চাকুরীর সুবাদে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় বদলির কারনে সে অনেকদিন গ্রামে আসতে পারেনি।। আজ ৬ বছর পরে তার মায়ের সাথে দেখা হবে। মা ফোনে অনেক কান্নাকাটি করে। জয়ন্ত ট্রেনে, আর কিছুক্ষন পর ট্রেন আলিপুরে এসে থামবে।মনটাও তার বিচলিত কখন সে গ্রামের সবার সাথে দেখা করবে। এই কথা ভাবতে ভাবতে ট্রেন এসে থামলো ষ্টেশনে।ট্রেন থেকে নামলো, হাত ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে রাত প্রায় ১০টা।
বাড়ি পৌছাতে আরো প্রায় ২ থেকে ৩ ঘন্টা লাগবে।এখান প্রায় ২২ থেকে ২৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে নিজ বাড়িতে যেতে।এখন কোনকিছু পাওয়াও মুসকিল।ট্রেনটা আজ আসতেও অনেক দেরি করে ফেলেছে।রাস্তায় যেন কি প্রবলেম হয়েছিলো।যার কারনে প্রায় দুই ঘন্টা দেরি হলো আলিপুর আসতে।সিগারেটের নেশা ধরেছে তার কারন ট্রেনে বসে সিগারেট খায়নি।মনে মনে ভাবলো আগে ষ্টেশনে বসে একটা সিগারেট ধরাই তারপর ভাববো কিভাবে বাড়ি যাওয়া যাবে।জয়ন্ত এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো কোথাও বসার জায়গা নেই।আরো ভাল করে সব দিক তাকালো।
অই তো একটা খালি সিট দেখা যাচ্ছে,পাশে একটা মেয়ে বসা।জয়ন্ত ধীরে ধীরে কাছে গেলো,জয়ন্ত কাছে যেতেই দেখলো একটা ফুটফুটে সুন্দর মেয়ে,পাশে একটা ট্রাভেল ব্যাগ।বুঝতে বাকি নেই,মেয়েটা এখানে বেড়াতে এসেছে অথবা কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে।জয়ন্ত ইতস্ত করছে মনে মনে এই মেয়েটির পাশে বসা ঠিক হবে কিনা! আবার সরে যাবো তাও মন চাইছে না।নেশা ধরা সুন্দর মেয়েটি।বিধাতা তাকে নিজ হাতে বানিয়েছে।হঠাৎ একটা সুরেলা কন্ঠের কথা কানে আসলো, ভাবনার আকাশ থেকে ফিরে এলাম।সেই মেয়েটি বলতে লাগলো – দাদা এখানে বসতে পারেন।আমি মনে কিছু করবো না।ও আচ্ছা, ঠিক আছে।জয়ন্ত বসতে বসতে বলতে লাগলো, কিছু মনে করবেন না,কোথাও বসার জায়গা পেলাম না।এদিকে সিট খালি দেখতে পেলাম তো।
এরপর কয়েক মিনিট নিরব রইলাম দুজনে।নিরবতা ভেংগে মেয়েটি বলে উঠলো দাদা আপনি কোথায় যাবেন? আমি বললাম হাতিপোতায় যাবো। কি কারনে যাচ্ছেন আবার বলে উঠলো? আমার গ্রামের বাড়ি।অনেকদিন পর বাড়িতে যাচ্ছি।কে কে থাকে দাদা ওখানে? আমার মা,দিদি আর ছোট ভাই।চাকুরীর জন্য এতো বিজি ছিলাম যে তাই এতোদিন আসতে পারি নাই।দাদা আপনাদের বাড়ি থেকে তুততুরি বাগান কতদূর? বেশি দূর না।বাড়ি যেতে আগে সে যায়গাটা পড়বে।তাই দাদা।আমি বললাম হ্যা।আচ্ছা দাদা ওখানে তপন নামে কেউ কে কি চিনেন?কোন তপন? তপন রায়।
হ্যা,হ্যা,চিনিতো।ও আমার বাল্যকালের বন্ধু।ও তো মনে হয় ওখানে নেই কারন প্রায় সাতবছর আগে আসামে চলে গিয়েছিলো মামার বাড়ি পড়াশুনা করতে।প্রথম প্রথম মাঝে মাঝে ফোনে কথা হতো কিন্তু নাম্বার হারিয়ে ফেলাতে অনেকদিন ধরে ওর সাথে যোগাযোগ নেই।মেয়েটি বলে উঠলো – জানি তো দাদা।কিন্তু এখন সে বাড়িতে ফিরে এসেছে।একটা কলেজে চাকুরী করে।তাই নাকি?যাক ভালো হলো ওর সাথে তাহলে দেখা হবে।আমি দশ বারোদিন থাকবো ছুটিতে,আবার চলে যেতে হবে কলকাতায়।ওখানে চাকুরী করি। আমিও মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনার বাড়ি কোথায়? এই প্রথম আমি প্রশ্ন করলাম তাকে।আমি অবাক হলাম আমাকে নিয়ে,আমি মেয়েটির সব প্রশ্নের উত্তর দিলাম গরগর করে, আগ বাড়িয়ে অথচ আমি এই চরিত্রে মানুষ না।কি ক্ষমতা মেয়েটির! দাদা আমার বাড়ি কলকাতায় মেয়েটি বলতে লাগলো।
এখন আমি আবার তাকে বল্লাম, আপনি কি কলকাতায় যাবেন? না দাদা।আপনি কি একা এসছেন এখানে? হ্যা দাদা।আপনি কোথায় যাবেন তাহলে? আমি তুততুরি বাগানে যাবো কিন্তু কিভাবে যাবো বুঝতে পারছি না,অনেকক্ষন ধরে বসে আছি,যার আসার কথা আমাকে নিতে সে এখনো আসছে না।অনেক ভয়ে ভয়ে বসে আছি।আমি এই প্রথম এখানে এসেছি।এখানকার মানুষজনও আমি চিনি না,কি ধরনের পরিবেশ তাও বুঝতে পারছি না।কি করবো মাথায় ঢুকছে না।
মেয়েটির কথা শুনে আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম।এতো সুন্দর মেয়ে,যে কোন সময় বিপদ হতে পারে একা কেউ জানলে।আমি মেয়েটিকে বললাম,এখন কি করবেন তাহলে? আমি বুঝতে পারছি না দাদা।আমাকে কি আপনি আপনার সাথে নিয়ে যাবেন? আমাকে একটু হেল্প করেন ওখানে যেতে। হয়তো ভগবান আপনাকে পাঠিয়েছে আমাকে একটু সহযোগিতা করতে।বলতে বলতে মেয়েটি কেঁদে ফেললো।
আমিও কি করবো বুঝতে পারছি না,দয়া করে কাঁদবেন না,দেখি কি করা যায় আপনার জন্য।দাদা সারারাত আমি এখানে থাকলে ভয়ে মারা যাবো।জয়ন্ত বলে উঠলো আপনি কোন চিন্তা করবেন না।আমি আমার সাথেই তপনের ওখানে নিয়ে যাবো কথা দিলাম।আপনি নিশ্চিত থাকেন।মেয়েটি আমার আশ্বাস পেয়ে কান্না থামিয়ে দিলো।এখন বাইরে গিয়ে দেখি কিছু পাওয়া যায় কিনা বাড়িতে যাওয়ার জন্য।আপনি বসে থাকেন এখানে আমি বাইরে যেয়ে দেখি।এই কথা বলতে না বলতেই মেয়েটি বলে উঠলো – দাদা আমি ও আপনার সাথে সাথে যাবো,একা থাকবো না।প্লিজ দাদা আমাকে সাথে নিয়ে বের হোন।
আচ্ছা ঠিক আছে আমার সাথেই যাবেন।তার আগে আপনাকে একটা প্রশ্ন করি? করেন দাদা? তপন আপনার কি হয়? এই কথা শুনে মেয়েটির জোরে জোরে কাঁদতে লাগলো? ওর কান্না শুনে অনেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।প্লিজ কান্না থামান,দেখছেন তো কিভাবে ওরা তাকিয়ে আছে।চোখ মুছতে মুছতে বলতে লাগলো – তপন কে আমি খুব ভালোবাসি।আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না।আমাকে আমার মা বাবা অন্য জায়গায় বিয়ে দিচ্ছে,সব ঠিক হয়ে গেছে,তাই আমি পালিয়ে এসেছি।তপন কে ফোন করেই আমি এখানে এসেছি কিন্তু আমি ওর জন্য অপেক্ষা করছি সেই কখন থেকে কিন্তু এখনো আসছে না সে।
ওর কথা শুনে মনে মনে ভাবছি- তপন অই ধরনের ছেলে না,কথা দিয়ে সে কথা রাখবে,কেন এলো না,হয়তো কোন সমস্যা হয়েছে।মাসিমা কে সব বলেছে আর মাসিমা ওকে আসতে দেয়নি মনে হয়। তপনের মা আবার অনেক রাগী। কিন্তু মাসিমা মেয়েটিকে দেখলে,একবাক্যেই মেনে নিবে কারন এতো সুন্দর মেয়ে আমাদের এলাকাতে নেই বললেই চলে।দেখি মেয়েটির জন্য কি করা যায়। অল্প কিছুক্ষন ধরে আছি মেয়েটির সাথে কিন্তু অনেক মায়া লেগে গেছে আমার।
শুনো মেয়ে আর কাঁদবে না আমি সব ব্যবস্থা করছি তোমাকে নিয়ে যাওয়ার,তুমিতো আগেই জেনেছো তপন আমার বাল্যকালের বন্ধু।তাই তুমিও এখন আমার আপন জন।তোমাকে তপনের ওখানে নেয়ার দায়িত্ত আমার।মেয়েটি আমার কথা শুনে চোখ মুছতে মুছতে হেসে ফেললো।এখন কি তোমার নামটা জানা যাবে? জি,দাদা,আমার নাম সুহাসিনী। বাহ অনেক সুন্দর নাম।মানুষটার সাথে নামের খুব মিল।
আচ্ছা শুনো আর এখানে বসে থেকে লাভ নেই।যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করতে হবে।জি,দাদা চলেন।স্টেশনের বাইরে এসে একটা জায়গায় সুহাসিনী কে দাঁড়িয়ে রেখে আমি যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করতে গেলাম।
অনেক চেষ্টার পর একটা গরুর গাড়ি কপালে জুটলো,বুঝতে বাকি রইলো না,মদ খেয়ে টাল সে, জানি না কোন খালে আমাদের ফেলে দেয় কিন্তু উপায় নেই যেতে হবে।এতো রাতে কেউ কোনদিন এতো দূরে যাবে না,লোকটি মাতাল দেখেই রাজি হয়েছে।
যাহোন সুহাসিনী কে নিয়েই গাড়িতে উঠলাম।সারা রাস্তায় আরো অনেক কথা হলো।মেয়েটি খুব সরল মনের।শুধু তপনের কথা বলেই যাচ্ছে।মনে মনে ভাবছি তপন অনেক ভাগ্যবান।এতো সুন্দর আর ভালো মনের মানুষ পেয়েছে।
এইতো এসে পড়েছি আপনার শশুড় বাড়ি।
মেইন রাস্তার ধারেই ওদের বাড়ি।সুহাসিনী গাড়ির থেকে নামলো,আমি ও নামলাম,ওকে তপনের বাসায় দিয়ে আবার এই গাড়িতেই যেতে হবে।আমি সুহাসিনী কে দেখালাম,অই যে বাড়িটা দেখা যাচ্ছে।অইটাই তপনের বাড়ি।তাই নাকি দাদা? দাদা তাহলে আর আপনাকে কষ্ট করতে হবে না,আমি একাই যেতে পারবো।না,না তা হয় না, আমি ও যাই দিয়ে আসি।না দাদা,আপনি অনেক কষ্ট করেছেন,
ক্লান্ত ও খুব আপনি।সুতরাং আপনি চলে যান।মেয়েটি এতো জেদ করছে।উপায় না দেখে বললাম ঠিক আছে।আমি গাড়িতে উঠতেই সুহাসিনী বললো,দাদা এতোদূর পথ আপনার সাথে এলাম কিন্তু আপনার নাম জানতে পারলাম না আর তপনকেই বা কি বললো কে আমাকে নিয়ে এসেছে?সুহাসিনীর কথা শুনে হাসতে হাসতে বললাম- তপনকে বইলো জয়ন্ত। আরও বইলো,আমি দেখা করবো দুই একদিনের মধ্যে।ঠিক আছে দাদা,নমস্কার।আবার দেখা হবে।বলেই সে হাটা দিলো।আমি মাতালের সাথে ঢুলতে ঢুলতে বাড়ি এসে পড়লাম অনেক রাতে।
বেশ কয়েকদিন পারিবারিক কাজে অনেক বিজি ছিলাম।অনেকদিন পরে আসা তাই অনেক কাজ আমাকে গুছাতে হলো কারন আবার কবে আসি গ্রামে ঠিক নেই।হালকা খিদে লেগেছে,পাশে একটা দোকান দেখতে পেয়ে যেখানে জয়ন্ত গেলো চা বিস্কুট খেতে।চায়ের কাপে চুমুক দিতেই রাস্তা দিয়ে একজন সুন্দর মেয়ে যেতে দেখলো আর তখনি তার সুহাসিনীর কথা মনে পড়লো।সর্বনাশ আমার না তপনের সাথে দেখা করার কথা ছিলো।আর দেরি নয়।আজ না দেখা করলে আর দেখা করার সময়ও আমি পাবো না।হাটা শুরু করলাম বাসষ্টানের দিকে, বাস পাবো মনে হচ্ছে। আমাদের এখানে সব সময় বাস পাওয়া যায় না।সারাদিনে তিনবার বাস পাওয়া যায়।ভাগ্য ভালো বাস পেয়ে গেলাম।বাসে উঠতেই বাস ছেড়ে দিলো।আধঘন্টার মধ্যেই পৌছে গেলাম সেখানে।
তপনের বাড়ির সামনে গিয়ে নাম ধরে ডাকতেই তপন বেরিয়ে এলো।বহুদিন পর দেখা বাল্য দুই বন্ধুর।দুইজন দুইজনকে জড়িয়ে ধরলো।কেমন আছিস জয়ন্ত? আমি ভাল আছি আর তুমিও কম ভাল নেই জানি আমি।জয়ন্তের মুখে এই কথা শুনে তপন বললো নারে বন্ধু, ভাল নেই আমি।আমার উপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গেছে।মিথ্যে নাটক করিস না তপন।তুই অনেক ভাল আছিস আমি জানি।আমার কাছে লুকাচ্ছিস কেন? সুহাসিনী বৌদি কৈ? সে বলে নাই আমার কথা তোকে?আমি তাকে তোর বাড়ি অবধি দিয়ে গিয়েছিলাম।কিছুই বলে নাই সে তোকে? অনেক সুন্দর বউ পেয়েছিস তুই।
খুব ভাগ্যবান তুই তপন।কিরে এতো কথা বলছি অথচ কোন উত্তর দিচ্ছিস না যে।হ্যা,বলছি, তুই ও তাহলে ওকে দেখেছিস? দেখেছি কি রে,আমিতো তোর বাসার কাছে নিয়ে এসেছিলাম। তপন বললো সব তোকে বলছি, আগে চল বাহিরে কোথাও নিরিবলি বসি।ঠিক আছে চল দোস।মাঠে গিয়ে দুইজন বসলাম।এখন শোন জয়ন্ত সব তোকে বলছি।সুহাসিনী এই দুনিয়ায় নেই।সে মারা গেছে দুই বছর আগে।কি বলছিস তপন? আমিতো নিজে ওকে সেদিন সাথে করে নিয়ে আসলাম আলিপুর থেকে।না জয়ন্ত আমি যা বলছি সব সত্য,সুহাসিনী আর নেই।তার আত্মা শুধু ঘুরে বেড়াই আমার আশপাশে।
এইভাবে অনেকেই তাকে দেখেছে এবং আমার বাড়ির সামনে নাকি তাকে দিয়ে যায়।কিন্তু জানিস, সুহাসিনী বাসায় কখনো আসে না।তোরা চলে গেলে সেও চলে যায়।জয়ন্ত অবাক হয়ে তপনের দিকে তাকিয়ে আছে,কি বলছে তপন।জয়ন্ত শরীর কাঁপছে, ঘেমে সারা শরীর ভিজে গেছে।কি বলছে তপন,এটা কিভাবে সম্ভব।জানিস জয়ন্ত অনেক ভালোবাসতাম সুহাসিনী কে,আজো তেমনি ভালোবাসি।আর সেও আমাকে খুব ভালোবেসেছিলো,আজো বাসে আর আজো ভালোবাসে বলে আমাকে ছেড়ে যায় না, তার আত্মা আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে না।শুনতেছিস তো জয়ন্ত? হ্যা,শুনতেছি,হ্যা সত্যি সত্যিই জয়ন্ত অন্যমনষ্ক হয়ে গিয়েছিলো অজানা এক রহস্যের গন্ধে।
আচ্ছা তপন তুই আসামে ছিলি আর মেয়েটি কলকাতায়, কি করে তোদের রিলেশন হলো আর কিভাবে সুহাসিনী মারা গেলো সব খুলে বল।শুন তাহলে জয়ন্ত,সব খুলে বলছি।আমি পড়াশুনা করার জন্য আসামে মামার বাড়ি যখন থাকি।তখন একদিন সুহাসিনীর সাথে দেখা হয়।সুহাসিনীর পিসাতো বোন তাকে আমাদের বাসায় এনেছিলো ।আমাদের পাশের বাড়িটি ছিলো ওর পিসির বাড়ি।কলকাতা থেকে বেড়াতে এসেছিলো পিসির বাড়ি।বড় আদরের মেয়ে ছিলো তাদের এবং একটি মাত্র মেয়ে সে।
বাবা বড় ব্যবসায়িক।কোন কিছুর অভাব সে পায়নি তার জীবনে।দেখতেও যেমন ছিলো,তেমন ছিলো কোমল স্বভাবের।।প্রায় আসতো আমাদের বাড়িতে আর আমরা তিনজনে মিলে অনেক গল্প গুজব করতাম।একটা সময় দুজন দুজনকে ভালোবেসে ফেললাম।মাস একের মতো ছিলো আসামে, তারপর ওকে চলে যেতে হলো কলকাতায়।আর তখন থেকেই শুরু হলো আমাদের কষ্টের দিবস রজনী।আমার মামার বাড়িতে ফোন না থাকায় পাশের দোকান থেকে কথা বলতাম প্রতিদিন।ওদের নিজেদের ল্যান্ড ফোন থাকায় আমার সাথে যে প্রতিদিন কথা বলে সেটা তার মা টের পেয়ে গেলো।
একদিন ওকে ডেকে তার বাবা মা জিজ্ঞেস করায় সুহাসিনী সব বলে দিলো আর তখন থেকেই শুরু হলো কাল বৈশাখী ঝড়।ওরা খুব বিত্তশালী আর আমরা ওদের সমকক্ষ নই তাই তার বাবা এটা মেনে নিলো না।একদিন আসামে এসে ওর বাবা মা মামাকে অনেক অপমান করে যায় আর বলে আমাকে যেন এখানে রাখা না হয় গ্রামে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে যেন দেয়া হয় কারন আমাদের রিলেশনটা ওর পিসাতো বোন জানতো আর আমাদের অনেক হেল্প করতো।তাই আমি যেন আসামে না থাকি।মামা কে শাসিয়ে যাবার পর, সেই রাতে মামা আমাকে ডেকে নিয়ে বললো – তপন কাল সকালের ট্রেনে বাড়ি চলে যাবি,এই নেও টিকেট।আমি বাকরুদ্ধ হয়ে বসে সব শুনেছিলাম আর টিকিটটা হাতে নিয়ে পরের দিন সকালে ট্রেনে উঠলাম বাসার উদ্দেশ্যে।অনেক দিন কথা হয়নি সুহাসিনীর সাথে মা দিব্যি দিয়েছিলো কারন মা তো সব জেনে ছিলো মামার কাছ থেকে।
প্রায় ছয়মাস পর হঠাৎ একদিন তপু দাদার দোকানে ফোন আসলো,দাদা ডেকে বললো আমার ফোন।আমি রিসিভ করার পর হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে কান্নার আওয়াজ এলো,আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না, সুহাসিনী ফোন করেছে।আমি ওকে বললাম এই নাম্বার কোথায় পেলে?সে বললো ওর পিসাতো বোনের মাধ্যমে আমার মামাবাড়ি থেকে নাম্বার নিয়েছে।সে কাঁদতে কাঁদতে বললো তার বাবা তার বিয়ে ঠিক করেছে,সে বিয়ে করবে না।পরেরদিন সকালে সে আলিপুর আসবে পালিয়ে,আমি যেন ষ্টেশনে গিয়ে তাকে নিয়ে আসি।আমাকে ছাড়া সে থাকতে পারবে না।
শুধু সুহাসিনী কেন, ওকে ছাড়া থাকতে আমারও খুব কষ্ট হবে।যাহোক সে রওয়ানা দিয়েছে পরেরদিন ।ট্রেনে উঠার আগে ওর সাথে কথা হয়েছে আমি ষ্টেশনে যাবো ওকে আনতে।কথা বলে বাড়ি এলাম কিন্তু ভাগ্য এতো খারাপ বাসায় এসে দেখি মা কুয়োর পাড় পা পিছলে পড়ে পা ভেংগে গেছে।তাড়াতাড়ি মা কে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম, দ্রুত সমাধান করতে হবে কারন সুহাসিনী আসছে আর এখানকার কিছুই সে চিনে না।মা কে নিয়ে হাসপাতালে আমার অনেক দেরি হয়ে গেলো,মা কে হাসপাতালে রেখে আমি রেল ষ্টেশনে যাবার জন্য রওয়ানা হলাম কিন্তু পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে গেলো।ভিতরে গিয়ে আমি ওকে খুঁজতে লাগলাম, কোথাও পাচ্ছি না ওকে,আমি টেনশনে এতো অস্থির ছিলাম যে ষ্টেশনের রেল লাইনের ওখানে অনেক মানুষ জড় হয়ে কি যেন দেখছে আর আহারে আহারে বলছে।আমি দৌড়ে গেলাম ওখানে,মনের ভিতর ছিলো প্রচন্ড ভয়।
ভিড় ঢেলে ভিতরে গিয়ে দেখি সুহাসিনী নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। আমি বসে ওকে আমার কোলের উপরে শোয়ালাম আর এক মাতাল বলছে বিড়বিড় করে- আমি চিনি ওদের।ওদের জন্য আজ এই ফুটফুটে মেয়েটি মারা গেলো।পিচাশ, নরপিচাশ ওরা।পরে শুনতে পেলাম কয়েকটা বখাটে ছেলে ওকে বিরক্ত করায় ভয়ে দৌড় দিয়েছিলো রেললাইনের উপর দিয়ে আর তখনি চলন্ত ট্রেন এসে আমার সুহাসিনী কে চির নিদ্রায় শুইয়েদিলো।তপন বলতে বলতে কেঁদে ফেললো।তারপর কি হলো তপন? আর কি হবে ওর মরদেহ ওর বাবা মা এসে নিয়েগিয়েছিলো।আমিও কিছুদিন পর একটু স্বাভাবিক হয়ে সেই মাতাটাকে ষ্টেশনে খুঁজতে গেলাম, সে জানতো কারা সেদিন ওকে বিরক্ত করেছিলো।
ওদের নাম জানতে পারবে আমি ওদের নিজের হাতে শেষ করতাম কিন্তু মাতাল লোকটাকে খুঁজে পেলাম না তখন ষ্টেশনের অনেককে জিজ্ঞাসা করলাম, ওকে সবাই মোটামোটি চিনে কারন সে মদ খায় আর ষ্টেশনে রাত পার করে।যাহোক একজন আমাকে ডেকে বললো – মাতাল লোকটাকে কারা যেন খুন করেছে।সে আর নেই এই ধরায়।শুনার সাথে সাথে আমার মাথায় আকাশ ভেংগে পড়লো আর পেলাম না নিজ হাতে ওদের শাস্তি দিতে কারন মাতালটাই দেখেছিলো ওদের।এই ভাবে আমার জীবনকে শূণ্য করে সুহাসিনী আমাকে একা রেখে চলে গেলো পরপারে কিন্তু তার আত্মা রয়ে গেলো আমার আশপাশে।
আমি সব শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম,আমি সেইদিন প্রায় তিন থেকে চার ঘন্টা সুহাসিনীর সংগে ছিলাম কিন্তু এতোটুকুও বুঝতে পারলাম না যে সে মানুষ না।ও আরেকটা কথা,তুই মনে হয় ভুলে গেছিস,এতো রাতে আমাদের এখানে আলিপুর থেকে আসার কোন যানবাহন নেই।তুই যে গরুর গাড়িতে এসেছিলি সেই গাড়ি কে চালাচ্ছিলো জানিস? সেই মাতাল লোকটা যে নাকি জানতো ওদের নাম,তাকেও খুন করে সুহাসিনীর জন্য।তাই তো তপন! আমি তো খেয়াল করিনি।এতো নির্বোধ হলাম কি করে সেদিন আমি।তাছাড়া এই কয়দিনেওতো ভাবিনি।
জয়ন্ত সব শুনলি তো! এই হচ্ছে আমার সুখের জীবন।তুইতো বললি আমি অনেক সুখে আছি।মা আমাকে বিয়ে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে কিন্তু আমি বিয়ে করবো না এই জীবনে কাউকে। আমার সুহাসিনী আজো বেঁচে আছে আমার মনে।আমি শুধু সুহাসিনীর আর কারো না।জয়ন্ত অনেক শুনেছিস আমার সুহাসিনীর গল্প,এখন বাড়ি চল, আজ আমাদের বাড়িতে খাবি।না তপন আজ আর যাবো না।অন্য একদিন আসবো বন্ধু সেদিন খেয়ে যাবো।জোড় করিস না, চল উঠ।তপনের হাত ধরে উঠিয়ে চললাম দুইবন্ধু।
বাসষ্টান যেতেই গাড়ি পেয়ে গেলাম।তপনকে বললাম ভাল থাকিস, থাকার চেষ্টা করিস আর কখনো সুহাসিনী কে ভুলে যাস না,সেটা আমিও চাই তোর মতো।তুইও ভাল থাকিস জয়ন্ত।গাড়িতে উঠে সিটে বসে একা একা ভাবতে লাগলাম,সে রাতে আমি ওর কত কাছাকাছি ছিলাম অথচ আমি একটু ও বুঝতে পারিনি সুহাসিনী আর সেই মাতাল কে।সেই রাতে যদি জানতাম তাহলে ভয়ে আমি রাস্তায় মরে পড়ে থাকতাম।অনেকে নাকি দেখেছে কিন্তু আমি খুব ভয় পাই শুধু এই আত্মার কথা শুনলেই অথচ আমি ওদের সাথেই গভীর রাতটা পার করলাম।ভয়ে আমার সারা শরীর শিউরে ওঠছে আবার সুহাসিনীর মুখটা যখন ভেসে উঠছে,তখন সুহাসিনীর জন্য খুব খারাপ লাগছে।অনেক ভাল মেয়ে সে।তপন ওকে নিয়ে খুব সুখী হতো।ঈশ্বর যে ওদের দুজনকে আলাদা করেছে তুমি তাদের বিচার কইরো।
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে রওয়ানা দিতে হবে চাকুরীর স্থলে।বাসায় গিয়ে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকাল সকাল উঠে সবার কাছে বিদায় নিয়ে চলে এলাম সেই ষ্টেশনে, টিকিট হাতে নিয়ে রেলের জন্য অপেক্ষা করছি।চোখ ওইসিটে না পড়ুক তার চেষ্টা করছি কিন্তু পারছিনা , তাকিয়ে রইলাম সেই সিটে সেখানে সুহাসিনীর সাথে বসে ছিলাম কিছুক্ষণ। ভাল থেকো সুহাসিনী আর দোয়া রইলো তুমি যেন স্বর্গবাসী হও আর তোমার আত্মার যেন মুক্তি হয়,বিধাতা যেন তার কাছে নিয়ে যান।ট্রেনের শব্দ পাচ্ছি,এখনি চলে আসবে।বলতে বলতেই ট্রেন চলে এলো, আমি উঠে জানালার পাশে বসলাম, ট্রেন ছাড়লো আর আমার চোখ সেই সিটে সেখানে সুহাসিনীর সাথে আমার দেখা হয়।যতক্ষণ চোখের আড়াল না হলো ততক্ষন সেই দিকে চেয়ে রইলাম আর কে যেন আমাকে বলছে, দাদা আপনি কবে আসবেন? আপনার সাথে তপনের বাসায় যাবো,দাদা আমি তপনকে ছাড়া থাকতে পারবো না ।দাদা আপনি তাড়াতাড়ি ফিরে আইসেন ।আমি আপনার অপেক্ষায় সেই সিটে বসে থাকবো।….!
( ভারতের সেই জায়গার প্রায় ৫০/৬০ বছর আগেকার পরিবেশটা কাল্পনিক গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। জায়গাটা আমারওজন্মস্থান।)

0 Comments

Leave a Comment

সব খবর (সব প্রকাশিত)

লক্ষ্য করুন

প্রবাসের আরো খবর কিংবা অন্য যে কোন খবর অথবা লেখালেখি ইত্যাদি খুঁজতে উপরে মেনুতে গিয়ে আপনার কাংখিত অংশে ক্লিক করুন। অথবা ‌উপরেরর মেনু'র সর্বডানে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন এবং আপনার খবর বা লেখার হেডিং এর একটি শব্দ ইউনিকোড ফন্টে টাইপ করে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ।