Tuesday, October 17, 2017

এক.
বাংলাদেশে যাবো যাবো বলে কেমন করে আটটি বছর চলে গেলো। এই আটটি বছর কম কথা নয়। এসময়ের মধ্যে অনেক আপনজনকে হারিয়েছি। আবার অনেক নতুনকে পেয়েছি। কানাডায় এসেছি প্রায় পঁচিশ বছর হয়েছে জীবন আর জীবীকার তাগিদে দুরন্ত গতিতে চলতে হয়েছে। পিছনে ফিরে থাকানোর সময় ছিলো না। এই দীর্ঘ প্রবাস জীবনে মাত্র তিনবার স্বদেশ ভ্রমন করার সুযোগ হয়েছে। একবার দেশে যাওয়া মানে সর্বস্বান্ত হওয়া। তবুও দেশ বলে কথা। প্রবাসে এই কষ্ট-কঠিন জীবনের মাঝে বার বার দেশে যেতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করলেই কী সম্ভব! কত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। কাজ-কাম, সন্তানদের স্কুল ফেলে যেতে হয়।
২৫ ডিসেম্বর ক্রিসমাস ডে তে সাধারণত তুষারপারত থাকে। ২০১৬ এর ২৫ ডিসেম্বর ছিলো দেশে যাবার দিন। আমার দু’যুগের কানাডা জীবনের অধিকাংশ সময়ই তা ঘটেছে। তুষারপাতহীন ক্রিসমাস থাকায় রাস্তা খুবই পরিস্কার ছিলো। কাতার এয়ার ওয়েজের প্লেনটি Montreal-Pierre Elliott Trudeau International Airport থেকে রাত নটা পাঁচে ছাড়বে তাই পাঁচটায় বাসা থেকে বের হই। আমাদেরকে প্লেনে তুলে দেওয়ার জন্য সহকর্মী বন্ধু রহমান ভাই, মামুন ভাই এবং তাপসদা গাড়ী নিয়ে আসলেন। যাবো তিনজন আর গাড়ী তিনখান। বেশ ভালোই লাগলো। কাতার এয়ারওয়েজে টিকিটটি বুক দেওয়ার সময় কনসালটেন্ট রেজা ভাই বলেছিলেন দোহায় যাত্রাবিরতী একটু বেশীসময় হওয়াতে হোটেল খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করবে। বাংলাদেশের সফরসময় খুবই কম হওয়াতে প্রথমে রাজী না হলেও দোহা শহরটি দেখার আগ্রহ থাকায় একুশ ঘন্টার যাত্রবিরতী মেনে নেই। শুনেছি দোহা শহরটি না-কি খুবই সুন্দর। দেখার মতো। মধ্যপ্রাচ্য দেশগুলোর মধ্যে দুবাই’র পরই কাতারের দোহা শহর। তাইতো বেশীসময় ট্রানজিট হওয়াতে খুশিই হয়েছিলাম। আমরা তিনজন যাচ্ছি দেশে বেড়াতে। আমি রুবী আর ছোট ছেলে সৌভিক। বড় মেয়ে মৌ মাস্টার্স শেষ করে সবেমাত্র চাকুরী পেয়েছে ফলে ইচ্ছে থাকাসত্ত্বেও নতুন চাকুরির জন্য আমাদের সঙ্গে যেতে পারছেনা। আর বড় ছেলে সম্রাট কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এর গুরুত্বপূর্ণ ইন্টার্নিশিপ থাকাতে সেও যেতে পারছেনা। আর ছোট ছেলে সৌভিক স্কুল বাদ দিয়ে দেশে বেড়াতে যাবেনা বলে দু’মাস ধরে প্রতিদিন কমপক্ষে শতবার বলছিলো। যাবে না, যাবেনা।

দোহা এয়ারপোর্ট

অবশেষে সবার অনুরোধে যেতে রাজি হলেও শর্ত একটাই তাঁর স্কুল দু’সপ্তাহ পরেই খুলবে তাঁকে পাঠিয়ে দিতে হবে। কোনক্রমেই স্কুল বাদ দিতে রাজি নয়। এমনকি স্কুল থেকে অনুমতি আনার পরও। আমরা তার কথামতোই রাজি হলাম। কি আর করা যায়! মৌ আর সম্রাটকে এই প্রথম একা রেখে যাওয়াতে রুবীর মন খুবই খারাপ। মা বলে কথা। যাবার তিন দিন পূর্ব থেকে তাদের জন্য টেনশনে শরীর খারাপ হবার অবস্থা। কত করে ওরা বোঝাচ্ছে তাদের কোন সমস্যা হবে না। ওরা বড় হয়ে গেছে। ওরা নিজেরা স্বাবলম্বী হয়েছে, নিজেরা একা একা চলতে পারে, কাজ করে! মৌ বাড়ির মরগেজ থেকে শুরু করে দেখাশোনার সব কাজ নিজ দায়িত্বে কাঁধে তুলে নিয়েছে। আমরা দেশে যাচ্ছি ফলে ওর চিন্তাটাও বেড়ে গেছে বিশেষ করে আমার জন্য। আমি লেখালেখি করাতে অনেকেই হয়তো ভালো চোখে দেখে না। আর দেশের যে অবস্থা! শুধু দুঃসবাদই পাচ্ছি! খুনখারাবি, সড়ক দুর্ঘটনা, প্রবাসীদের বাড়িতে ডাকাতি, অপহরণসহ রকমারি ঘটনায় ওরা ভীষণ চিন্তিত। মৌ আমাদের নিরাপত্তা সথর্ক থাকার জন্য কানাডা এম্বেসীতেও ইমেইল করে সব ইনফরমেশন পাঠিয়েছে। যাক্ আমরা ৭টার ভিতরেই বোডিং পাসসহ আনুষ্ঠানিক সব কাজ শেষ করে টিমহর্টনসে বসে বেশ কিছুক্ষণ আড্ডার পর প্লেনে ওঠার জন্য ভিতরে যাবার প্রস্তুতি নিতেই আবার রুবীর কান্না শুরু। মৌ তার বান্ধবী স্বর্না, সম্রাট সবাই বলছে চিন্তা না করার জন্য কিন্তু কে কার কথা শুনে! আমার সঙ্গে প্রায়োরেটি কার্ড থাকাতে লাইনে দাঁড়াতে হয়নি। কয়েক মিনিটের মধ্যে ভিতরে নিয়ে যায়। ভিতরে নিয়ে যাবার সময় সবাইকে কত রকমের পরীক্ষা করছে আর আমাকেতো আস্ত একটা মেশিনের ভিতরে ঢুকিয়ে পরীক্ষা করে যেতে দিলো। আমার কাছে বেশ মজাই লাগছিলো। কেন যে আমাকে তাদের সন্দেহ একটু বেশী করেছিলো বুঝতে পারিনি। সম্ভবত লাল কেটস আর পেটটা ঢুলের মতো হওয়াতে। যতবার দেশে যাই হাতে দু’টি লাগেজ থাকে ফলে খুব কষ্ট হয় তখন প্রতিজ্ঞা করি নেক্সটটাইমে খালি হাতে যাবো। কিন্তু সেকথা ভুলে গিয়ে একইভাবে যত বেশী লাগিজ নিতে পারি সেই চেষ্টাই করি। অভ্যাস বলে কথা। আমার সঙ্গে একটি ক্যারিয়ন, একটি কম্পিউটার এবং একটি বড় ক্যামেরার ব্যাগ। সহজেই বোধগম্য এসব নিয়ে প্লেনে ওঠা কত কষ্টকর। একই অবস্থা রুবী এবং সৌভিকের। যাহোক আমাদের প্রায়োরেটি কার্ডের সৌজন্যে লাইনের প্রথমে থাকাতে যেতে তেমন অসুবিধে হয়নি প্লেনের ভিতরে। কাতার এয়ারওয়েজের০৭৬৪ ফ্লাইটের প্লেনটি ছিলো বিশাল বড়। বেশ আরামদায়ক পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। সাড়ে ১৪/১৫ ঘন্টার আকাশপথ। তা-কি মুখের কথা! এত দীর্ঘ সময় প্লেনের ভিতর বসে থাকতে হবে! কিন্তু করার কিছুই নেই, নিরুপায় হয়েই বসে থাকতে হলো। মাঝেমধ্যে নিজেদের মধ্যে আলাপ করার পরই ঘুমের চেষ্টা। কিন্তু ঘুম কি আর আসে? কতক্ষণ পর পরই বিমানবালাদের মিষ্টি মুখের সুরেলা কন্ঠের ডাক! খাওয়ার আয়োজন। এভাবেই খাওয়া আর কিছুটা ঘুমের মধ্যে দিয়ে চলে গেলো সময়। পাইলটের ঘোষণায় জানা গেলো কিছুক্ষণের মধ্যে দোহা বিমান বন্দরে পৌঁছবে। বিমানের জানালা দিয়ে দেখলাম কিসুন্দর ঝকঝকে রোদ্দুর। বিমানটি তখনো ৩৫ হাজার ফুট উপর দিয়ে ৫২০ মাইল বেগে চলছে। এতই ঝলমল আলো ছিলো যে কেউই জানালাটা পুরোপুরি খোলার সাহস করেনি কারণ হয়তো অন্যের সমস্যা হবে বলে। সবাই ঘুম থেকে জেগে মনে মনে নামার জন্য তৈরী হলে কুয়াশার জন্য আধঘন্টা ডিলে হবে বলে পাইলটের কন্ঠে ঘোষণা শুনে মনটি খারাপ হয়ে গেলো। দোহা হামেদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে প্লেনটির চাকা যখন মাটিতে স্পর্শ করলো তখন কাতার সময় বিকেল সাড়ে ৫টা।
চলবে….
সদেরা সুজন, নির্বাহী, সিবিএনএ।

1 Comment

Kamal September 23, 2017 at 9:27 pm

Think for Canada and contribute….. Khamakha wasting time….

Leave a Comment

সব খবর (সব প্রকাশিত)

লক্ষ্য করুন

প্রবাসের আরো খবর কিংবা অন্য যে কোন খবর অথবা লেখালেখি ইত্যাদি খুঁজতে উপরে মেনুতে গিয়ে আপনার কাংখিত অংশে ক্লিক করুন। অথবা ‌উপরেরর মেনু'র সর্বডানে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন এবং আপনার খবর বা লেখার হেডিং এর একটি শব্দ ইউনিকোড ফন্টে টাইপ করে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ।