Dec 15, 2017

নিউইয়র্ক : জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের বক্তব্য রাখছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি-এনআরবি নিউজ।

এনআরবি নিউজ, নিউইয়র্ক থেকে : সাধারণ অধিবেশন কক্ষের নিরবতা ভেঙ্গে প্রাণ ফিরে সরব হলো শেখ হাসিনার বক্তব্যের সময়। ১৭ মিনিটের বক্তব্যে ৯ বার করতালির ঘটনা ঘটে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগে প্রায় ৪ ঘন্টায় ১৪ জন সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানের বক্তব্যের সময় এমন কোন ঘটনাই ঘটেনি। অর্থাৎ জেনারেল এ্যাসেম্বলী হল এক ধরনের স্থবিরতায় আক্রান্ত হয়েছিল।
২১ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় ৭২তম অধিবেশনের চতুদর্শতম প্লেনারি সেশন শুরু হয়। শেখ হাসিনা ছিলেন পঞ্চদশতম বক্তা এবং জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চতুর্দশ বার বক্তব্য উপস্থাপন। শেখ হাসিনাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধি দিয়েছে বিশ্ববরেণ্য মিডিয়া। সে আলোকে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন ‘আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। আমরা অর্থনৈতিক উন্নতি চাই, মানব ধ্বংস নয়- মানবকল্যাণ চাই । এটাই হোক আমাদের সকলের লক্ষ্য’। বক্তব্যের সমাপ্তিতেও দর্শক গ্যালারি এবং ভিআইপি গ্যালারি করতালিতে মুখরিত হয়। এ সময় ফ্লোরে বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীসহ শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিকরাও করতালিতে অংশ নেন।
শেখ হাসিনার আগে বক্তব্য দেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শহীদ খোকন আব্বাসী, মরিসাশের অর্থমন্ত্রী প্রভিন কুমার জুগনাথ, এন্টিগুয়া এবং বারবুডার প্রধানমন্ত্রী গ্যাস্টন আলফন্সো সপোয়াগা, জর্জিয়ার প্রধানমন্ত্রী জিয়র্জি কিভিরিকসইভিলি, জর্দানের বাদশা আল হোসেন বিন আব্দুল্লাহ দ্বিতীয়, ইন্দোনেশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জোসোফ কাল্লা, জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট গ্যাব্রিয়েল মুগাবে, গণপ্রজাতন্ত্রী সাউটোমে এবং প্রিন্সিপের প্রেসিডেন্ট ইভারিস্টো ডো ইসপিরিটো সান্টো কারভালহো, ইকুয়াটরিয়াল গীনির প্রেসিডেন্ট টিউডরো অবিয়াং সেগুয়েমা এম্বাসোগো, পালাউয়ের প্রেসিডেন্ট টমি ইসাং রিমেঙ্গোসাউ জুনিয়র, কমোরসের প্রেসিডেন্ট আযালি আসাইমানি এবং এল সালভেদরের প্রেসিডেন্ট সালভেদর সাঞ্চেজ কেরেন। এসব সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানদের বক্তব্য শোনার জন্যে কিংবা গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশের জন্যে খুব বেশী মিডিয়া কর্মী দেখা যায়নি। অপরদিকে, শেখ হাসিনার বক্তব্য শোনার জন্যে পুরো গ্যালারি পরিপূর্ণ ছিল। মিডিয়া বক্সের নাজুক অবস্থাও কেটে যায় অর্ধশত মিডিয়ার পদভারে।
ভিআইপি গ্যালারিতে ছিলেন শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়, দুই রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন এবং মাসুদ বিন মোমেনসহ বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা। বাংলাদেশ ডেস্কে ছিলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশারফ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম মাহমুদ আলী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত ড. এ কে এ মোমেন, প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারি আবুল কালাম আজাদসহ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা।
শেখ হাসিনা তার বাবার মতো বাংলায় দেয়া বক্তব্যের শুরুতেই রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ‘সাধারণ পরিষদের এই মহান অধিবেশনে বক্তব্য দিতে আমি চতূর্দশবারের মতো উপস্থিত হয়েছি। তবে আমার হৃদয় আজ দুঃখে ভারাক্রান্ত। কেননা আমার চোখে বারবার ভেসে উঠছে ক্ষুধার্ত, ভীত-সন্ত্রস্ত এবং নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মুখচ্ছবি। আমি মাত্র কয়েকদিন আগেই আমার দেশে আশ্রয় নেওয়া কয়েক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে দেখা করে এসেছি, যারা ‘জাতিগত নিধনে’র শিকার হয়ে আজ নিজ দেশ থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত। অথচ তারা হাজার বছরেরও অধিক সময় যাবত মিয়ানমারে বসবাস করে আসছেন।’
বাংলাদেশের জাতিরজনকের কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘এদের দুঃখ-দুর্দশা আমি গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারি। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আমার বাবা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পর আমি আমার ছোট বোনকে নিয়ে ৬ বছর উদ্বাস্তু জীবন কাটিয়েছি।’
বাবার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের হয়ে প্রথমবারের মতো এখানে ভাষণ দেয়ার সময় এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শান্তি ও ন্যায়বিচারের পক্ষে তাঁর অঙ্গীকারের কথা বলে গেছেন। সেই ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন: “এমন এক বিশ্বব্যবস্থা গঠনে বাঙালি জাতি উৎসর্গীকৃত, যে ব্যবস্থায় সকল মানুষের শান্তি ও ন্যায়বিচার লাভের আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হবে। এবং আমি জানি আমাদের এ প্রতিজ্ঞা গ্রহণের মধ্যে আমাদের লাখ লাখ শহিদের বিদেহী আত্মার স্মৃতি নিহিত রয়েছে”।
শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, ‘আমরা এই মুহূর্তে নিজ ভূখন্ড হতে জোরপূর্বক বিতাড়িত ৮ লাখেরও অধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় ও সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছি। আপনারা সকলেই জানেন যে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান নৃশংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অবস্থার ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। এই নৃশংসতার হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আন্তর্জাতিক আভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে গত তিন সপ্তাহে চার লাখ ত্রিশ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত যাওয়া ঠেকানোর জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সীমানা বরাবর স্থলমাইন পুঁতে রাখছে । এতে আমরা ভীষণভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এ সব মানুষ যাতে নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন এখনই তার ব্যবস্থা করতে হবে।’
‘একই সঙ্গে আমি সব ধরণের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করছি। এ বিষয়ে আমাদের সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মেনে চলে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতা বন্ধে এবং ঐ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করায় আমি নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রসমূহ ও জাতিসংঘের মহাসচিবকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহবান জানিয়ে সুনির্দিষ্ট ৫টি প্রস্তাব পেশ করেন শেখ হাসিনা। এগুলো হচ্ছে, ১. অনতিবিলম্বে এবং চিরতরে মিয়ানমারে সহিংসতা ও ‘জাতিগত নিধন’ নিঃশর্তে বন্ধ করা; ২. অনতিবিলম্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিজস্ব একটি অনুসন্ধানী দল (Fact Finding Mission) প্রেরণ করা; ৩. জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা এবং এ লক্ষ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষা বলয় (safe zones) গড়ে তোলা; ৪. রাখাইন রাজ্য হতে জোরপূর্বক বিতাড়িত সকল রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এবং ৫. কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত, পূর্ণ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবসের স্বীকৃতি প্রদানের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে এমন বর্বরতা ঠেকানোর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ ভয়াবহতম গণহত্যার শিকার হয় । ৯-মাসব্যাপী চলা মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ৩০ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে এবং ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করেছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে চিহ্নিত ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে তারা এই হত্যাযজ্ঞ চালায়। বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করতে তারা দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। গণহত্যার শিকার শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সম্প্রতি ২৫শে মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। মূলত ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেই ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে তারা এই গণহত্যার সূচনা করেছিল। এই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত মূল অভিযুক্তদের আমরা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করেছি। বিশ্বের কোথাও যাতে কখনই আর এ ধরনের জঘন্য অপরাধ সংঘটিত না হয় সেজন্য আমি বিশ্ব সম্প্রদায়কে সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি, ৭১-এর গণহত্যাসহ সকল ঐতিহাসিক ট্রাজেডির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আমাদের এ লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে ইতিমধ্যেই বিশ্বের কাড়তে সক্ষম শেখ হাসিনা বলেন, ‘স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই আমরা শান্তি-কেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ এবং পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ করে চলেছি। এ উপলব্ধি থেকেই সাধারণ পরিষদে ২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর ‘শান্তির সংস্কৃতি’ (culture of peace) শীর্ষক প্রস্তাব পেশ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সর্বদা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করা এবং ভ্রাতৃপ্রতীম ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈষম্য এবং শত্রুতা নিরসনের জন্য আমি সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা আশা করি, শান্তিবিনির্মাণে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা অব্যাহত থাকবে। এ লক্ষ্যে ‘অব্যাহত শান্তি’র জন্য অর্থায়ন বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছ থেকে আমরা সাহসী এবং উদ্ভাবনমূলক প্রস্তাব প্রত্যাশা করছি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘জাতিসংঘ শান্তিবিনির্মাণ তহবিলে’ আমি ১ লাখ মার্কিন ডলার প্রতীকী অনুদান প্রদানের ঘোষণা দিচ্ছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ এবং সহিংস জঙ্গিবাদ শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। একজন সন্ত্রাসীর কোনো ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নেই। আমি নিজে বেশ কয়েকবার সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছি। সে হিসেবে আমি সন্ত্রাসের শিকার মানুষের প্রতি আমার সহানুভূতি প্রকাশ করছি। আমি মনে করি তাঁদের সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। আমরা ধর্মের নামে যে-কোনো সহিংস জঙ্গিবাদের নিন্দা জানাই। সহিংস জঙ্গিবাদ বিস্তার রোধে তৃণমূল পর্যায়ে আমরা পরিবার, নারী, যুবসমাজ, গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করেছি। বৈশ্বিক এ সমস্যা মোকাবেলায় আমার প্রস্তাব হচ্ছে: এক, সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে হবে; দুই, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে; এবং তিন, শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্তর্জাতিক বিবাদ মীমাংসা করতে হবে ।’
‘অর্থ পাচার, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং অন্যান্য আন্তঃরাষ্ট্রীয় সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধের ক্ষেত্রে সাইবার জগত থেকে উদ্ভূত হুমকি মোকাবিলা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে আমি জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি’-বলেন শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়নে আমরা আশাবাদী। জাতীয় পর্যায়ে জলবায়ু সংবেদনশীলতার দিকে লক্ষ্য রেখে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় আমরা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে ‘ব্লু ইকনোমি’র সম্ভাবনার প্রতি আমরা আস্থাশীল। বাংলাদেশ বন্যা এবং অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলায় দৃষ্টান্তমূলক সাফল্য দেখিয়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে আমরা শস্য-নিবিড়করণ প্রযুক্তি এবং বন্যা-প্রতিরোধী ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছি। এ বছর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে যে ব্যাপক বন্যা আঘাত হেনেছে আমরা তা সফলভাবে মোকাবিলা করেছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘পানি বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের প্যানেলের সদস্য হিসেবে আমি এ সংক্রান্ত ‘সমন্বিত কর্ম-পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার প্রদান করছি। ২০১৫ সালের মধ্যে আমরা আমাদের ৮৭ শতাংশ নাগরিকের জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করেছি। ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জনগণকে নিরাপদ পানি সরবরাহের আওতায় আনা হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মনে করি শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য দারিদ্র্য, ক্ষুধা, নিরক্ষরতা এবং বেকারত্ব দূর করা অত্যন্ত জরুরি।’
এসডিজি প্রসঙ্গে বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। এক্ষেত্রে আমাদের সরকার সমাজের সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার নীতি গ্রহণ করেছে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম-আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে রূপান্তরের যে রূপকল্প আমরা হাতে নিয়েছি, এসডিজি তারই পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। মূলত এসডিজি গ্রহণের অনেক আগে থেকেই আমরা বেশকিছু কর্মসূচি এবং সামাজিক নীতি বাস্তবায়ন শুরু করেছি যা পরবর্তীকালে এসডিজি’তেও প্রতিফলিত হয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে : একটি বাড়ি একটি খামার, কমিউনিটি ক্লিনিক, আশ্রায়ণ প্রকল্প, ডিজিটাল বাংলাদেশ, শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি, নারীর ক্ষমতায়ন, সবার জন্য শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বিনিয়োগ ও উন্নয়ন। এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি এবং অঙ্গীকারের বিষয়গুলো আমরা এ বছর জাতিসংঘে ‘ভলান্টারি ন্যাশনাল রিভিউ’-এর মাধ্যমে তুলে ধরেছি ।’
বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির আলোকে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক দুই চার শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ৩২.১ বিলিয়ন ডলার। দারিদ্র্যের হার ১৯৯১ সালের ৫৬.৭ শতাংশ হতে কমে বর্তমানে ২৩.২ শতাংশ হয়েছে। মাথাপিছু আয় ২০০৫-০৬ অর্থবছরের ৫৪৩ মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১ হাজার ৬০২ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছরে উন্নীত হয়েছে। এ-সকল সূচক মূলত আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনার বাস্তবায়নকেই নির্দেশ করে । অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং সকলের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে আমরা সারাদেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছি। ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় আমরা সমাজের সবচেয়ে অসহায় ব্যক্তি যেমন বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী, পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী এবং আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্তদের সহায়তা করছি। শারীরিক এবং মানসিক প্রতিবন্ধীদের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করতে বিশেষ গুরত্ব দেওয়া হচ্ছে। অটিজমসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধকতায় আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য ১০৩টি সেবাকেন্দ্র এবং ৩২টি মোবাইল থেরাপি ভ্যান কাজ করছে।’
শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সারাদেশে সাড়ে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা হাসপাতাল হতে মোবাইল ফোন ও ওয়েব ক্যামেরার মাধ্যমে স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি গ্রামে একটি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। দেশের ৩৮ হাজার ৩৩১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে। যুবসমাজকে কারিগরি এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের মাধ্যমে জ্ঞান-ভিত্তিক সমাজ গঠনে আমাদের যুবসমাজ মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরির জন্য কাজ করছি যেখানে তারা যুগোপযোগী শিক্ষা গ্রহণ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে এবং প্রকৃত অর্থেই বিশ্ব নাগরিকে পরিণত হবে। আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে ঘোষণা করতে চাই যে, এ বছরের মধ্যেই আমরা প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উৎক্ষেপন করার পরিকল্পনা নিয়েছি।’
শেখ হাসিনা তার বক্তব্য শেষ করেন ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ এবং ‘বাংলাদেশ চিরজীবী হোক’ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে ।

 

0 Comments

Leave a Comment

মহিউদ্দিন স্মরণে দোয়া মাহফিল

নিউইয়র্ক (ইউএনএ): চট্টাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ইন্তেকালে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করে মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করা হয়েছে। দলের পক্ষ থেকে সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সামাদ আজাদ এক বিবৃতিতে এই শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, শুক্রবার (১৫ ডিসেম্বর) দিবাগত ভোর রাত ৩টার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর মেহেদিবাগে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন ইন্তেকাল করেন। খবর ইউএনএ’র।
এদিকে সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিনের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১৫ ডিসেম্বর শুক্রবার এক দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এদিন রাত ৯টায় জ্যাকসন হাইটসের নিউ মেজবান রেষ্টুরেন্টে এই দোয়া মাহফিল হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

পাঠকের মন্তব্য

লক্ষ্য করুন

প্রবাসের আরো খবর কিংবা অন্য যে কোন খবর অথবা লেখালেখি ইত্যাদি খুঁজতে উপরে মেনুতে গিয়ে আপনার কাংখিত অংশে ক্লিক করুন। অথবা ‌উপরেরর মেনু'র সর্বডানে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন এবং আপনার খবর বা লেখার হেডিং এর একটি শব্দ ইউনিকোড ফন্টে টাইপ করে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন।
ধন্যবাদ।