Nov 22, 2017

নিউইয়র্ক : এ অনুষ্ঠানেই প্রশ্নোত্তর পর্বে খান আতাউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অবস্থান সম্পর্কে বলেছিলেন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। ছবি-এনআরবি নিউজ।

এনআরবি নিউজ, নিউইয়র্ক থেকে : ‘চলচ্চিত্র পরিচালক ও অভিনেতা খান আতাউর রহমান রাজাকার ছিলেন এবং ‘আবার তোরা মানুষ হ’ মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী চলচ্চিত্র। দেশ স্বাধীন হবার পর আমি তার প্রাণ বাঁচিয়েছিলাম’-ইত্যাদি মতামত ব্যক্ত করেছিলেন নাট্যজন ও মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। বাচ্চু বলেছেন, ‘আবার তোরা মানুষ হ’-এটাতো নেগেটিভ ছবি। মুক্তিযোদ্ধাদের বলছে আবার তোরা মানুষ হ। তোকে মানুষ হতে হবে। তুই রাজাকার ছিলি।’
বাচ্চু উল্লেখ করেছিলেন,‘মুক্তিযোদ্ধাদের আবার তোরা মানুষ হ’ নামে ছবি করাও ছিল অপমানজনক।উদ্দেশ্যমূলক শিরোনামে এই সিনেমা বানানো। রাজাকাররা মানুষ হ’ সিনেমা নির্মাণ করা উচিত ছিল।’ বাচ্চু বলেছিলেন, ‘খান আতা রাজাকার, আমি না হলে খান আতা বাঁচতো না। আমি গৌরব করবো যে, আমি না হলে খান আতা -৭১ এ ১৬ ডিসেম্বরের পরে মারা যায়।’

ড. নীলিমা ইব্রাহিম কমিশনের রিপোর্ট।

গত ১২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্ক সিটির জ্যামাইকায় স্টার কাবাব রেস্টুরেন্টের মিলনায়তনে ‘বাংলা নাটকের সুবর্ণপুত্র নাসিরউদ্দিন ইউসুফের সাথে নিউইয়র্ক অভিবাসী সাংস্কৃতিক সহযাত্রীদের সম্মিলন’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে বক্তব্য উপস্থাপনের পর প্রশ্নোত্তর পর্বে মুক্তিযোদ্ধা বাচ্চু খান আতা সম্পর্কে এসব তথ্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে নানা প্রতিক্রিয়া/অভিমত পোষণ করা হচ্ছে। ঐ অনুষ্ঠানের আয়োজকদের অন্যতম যুক্তরাষ্ট্রস্থ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মিথুন আহমেদকেও গালিগালাজ করা হচ্ছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ অক্টোবর রোববার অপরাহ্নে নিউইয়র্কে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা ও চলচ্চিত্রকার বাচ্চু এনআরবি নিউজের এ সংবাদদাতাকে এক বিবৃতি প্রদান করেছেন। সাথে স্বাধীনতার পর গঠিত ড. নীলিমা ইব্রাহিম কমিশনের দেয়া রিপোর্টের কপিও দিয়েছেন। ঐ রিপোর্টে খান আতাকে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থানকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা বাচ্চু তার বিবৃতিতে বলেছেন, ‘সম্প্রতি নিউইয়র্কে সংস্কৃতি কর্মীদের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমার বক্তব্য শেষে এক প্রশ্ন উত্তরে কৃতি চলচ্চিত্র নির্মাতা, সংগীত পরিচালক ও অভিনেতা খান আতাউর রহমান সম্পর্কে আমার একটি উক্তিকে কেন্দ্র করে ফেসবুক ও অনলাইনে সংবাদ মাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক চলছে। অহেতুক বিতর্ক নিরসনে আমার কথা পুনর্ব্যাক্ত করছি।’
বাচ্চু বলেছেন, ‘বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সংগীত পরিচালক খান আতাউর রহমান ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনে অপারগ হয়েছিলেন। যে ৫৫ জন বুদ্ধিজিবী ও শিল্পী ১৯৭১ -এর ১৭মে মুক্তিযুদ্ধকে “আওয়ামী লীগের চরমপন্থীদের কাজ”বলে নিন্দাসূচক বিবৃতি দিয়েছিলেন দু:খজনক ভাবে খান আতাউর রহমান তার ৯ নম্বর সাক্ষরদাতা ছিলেন।@ ১৭মে ১৯৭১ দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকা দ্রষ্টব্য ।’
বাচ্চু উল্লেখ করেন, ‘১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার ড.নীলিমা ইব্রাহীম কে প্রধান করে ৬ সদস্যের কমিটি গঠন করেছিলেন রেডিও টেলিভিশনে পাকিস্তানীদের প্রচার কার্যে সহযোগীতাকারীদের শনাক্ত করার জন্য। ১৯৭২ -এর ১৩মে নীলিমা ইব্রাহীম কমিটি যে তালিকা সরকারকে পেশ করেন, সে তালিকায় ৩৫ নম্বর নামটি খান আতাউর রহমানের। তালিকাভুক্তদের সম্পর্কে কমিটির সুনির্দিষ্ট বক্তব্য রয়েছে। তালিকাভুক্ত শিল্পীদের ৬মাস পর অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করা হয়। দ্রষ্টব্য – বাংলাদেশ বেতার তথ্য মন্ত্রনালয়ের নং জি১১।সি-১।৭২।১৬/৬/৭২’
বাচ্চু বলেন, ‘একথা অনস্বীকার্য যে খান আতাউর রহমান একজন গুণী শিল্পী। তার সৃষ্টিশীলতা নিয়ে কোন প্রশ্ন নাই। মুক্তিযুদ্ধপূর্বকালে তাঁর চলচ্চিত্রসমূহ আমাদের ঋদ্দ্ব ও উজ্জিবীত করেছে । যেমন “সোয়ে নাদীয়া জাগো পানি”, “নবাব সিরাজদৌলা” সহ অনেক চলচ্চিত্র। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি পাকিস্তানের সমর্থক ছিলেন এবং তা তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে। আবার আলতাফ মাহমুদ, জহির রায়হান , শহীদউল্লাহ কায়সারের মত শিল্পী-সাহিত্যিকরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তাঁদের স্বীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এবং শাহাদাত বরণ করেছেন। অনেকের মনে প্রশ্ন উদ্রেক হয়েছে যে, ‘৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর অব্যহতিতে কেন আমি বা আমরা তাঁকে রক্ষা করেছিলাম। কারণ খান আতাউর রহমান কোন প্রকার মানবতা বিরোধী কর্মে লিপ্ত ছিলেন না; যদিও পাকিস্তানীদের সমর্থনে রেডিও-টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করেছেন। আর খান আতাউর রহমান একজন শিল্পী এবং ৯মাসে তাঁর কর্ম সম্পর্কে আমরা অবহিত ছিলাম না। তাছাড়া আমরা এও ভেবেছি ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক অনেকে পাকিস্তানীদের পক্ষাবলম্বন করেছে। আমরা তা বিচারের এখতিয়ার রাখিনা। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের এ কথা বাধ্যতামূলক মানতে বলা হয়েছিল যে, কোন অবস্থাতেই যুদ্ধোত্তর সময়ে কাউকে ক্ষতি বা আঘাত করা যাবেনা । বিচারিক প্রক্রিয়ায় দোষী সাব্যস্তদের বিচার করা হবে রাষ্ট্রীয়ভাবে। মুক্তিযোদ্ধারা সেই আদেশ পুরোপুরি ভাবে মেনেছিলো বিধায় যুদ্ধোত্তর কালে প্রাণহানির ঘটনা উল্লেখযোগ্য ভাবে কম হয়েছিল। জেনেভা কনভেনশন মুক্তিযোদ্ধারা পুরোপুরি মেনেছিলো কিন্তু পাকিস্তানীরা জেনেভা কনভেনশনের তোয়াক্কা করেনি।’
নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, ‘আমার মূল বক্তব্যে নয়, এক প্রশ্নের উত্তরে ইতিহাসের দায় থেকে আমি খান আতাউর রহমান সম্পর্কে উক্তিটি করেছিলাম। সবশেষে আবারো বলছি, খান আতাউর রহমান একজন সৃষ্টিশীল মানুষ কিন্তু ১৯৭১ সালে তিনি দেশ ও মানুষের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে আমার তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নাই, শিল্পী হিসাবে তাঁর প্রশংসা করি কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালে তার ভূমিকার সমালোচনা তো করতেই পারি।’
‘আশা করি আমার এ বক্তব্য সকল তর্ক-বিতর্কের অবসান ঘটাবে’-প্রত্যাশা বাচ্চুর।
প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য, ‘বাংলা নাটকের সুবর্ণপুত্র নাসিরউদ্দিন ইউসুফের সাথে নিউইয়র্ক অভিবাসী সাংস্কৃতিক সহযাত্রীদের সম্মিলন’ শীর্ষক ঐ অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন কম্যুনিটি এ্যাক্টিভিস্ট মিনহাজ আহমেদ সাম্মু এবং মুক্তিযোদ্ধা বাচ্চুর পাশে বসেছিলেন কন্ঠযোদ্ধা রথীন্দ্রনাথ রায় এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক মিথুন আহমেদ।

 

1 Comment

সাঈদ, মুক্তিযোদ্ধা বিমানসেনা October 18, 2017 at 9:59 pm

আমরা মুক্তিযোদ্ধারা ৭১ এর পর অনেককেই দেখেছি এবং চেয়েছিলাম ওদেরকে কতম করে দিতে কিন্তু পারিনি নানামুখী চাবে। এই খান আতা কিংবা মোনায়েম খান/সবুর খানরা তাদেরই দলের। এই খান আতাকে যারা আবার লাইম লাইটা আনার চেষ্টা করছেন তাদের কি উদ্দেশ্য?

Leave a Comment

সব খবর (সব প্রকাশিত)

লক্ষ্য করুন

প্রবাসের আরো খবর কিংবা অন্য যে কোন খবর অথবা লেখালেখি ইত্যাদি খুঁজতে উপরে মেনুতে গিয়ে আপনার কাংখিত অংশে ক্লিক করুন। অথবা ‌উপরেরর মেনু'র সর্বডানে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন এবং আপনার খবর বা লেখার হেডিং এর একটি শব্দ ইউনিকোড ফন্টে টাইপ করে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ।