Dec 11, 2017

উইলহেলমাস আব্রাহাম সাইমন ওডারল্যান্ড

ওডারল্যান্ড! নাম উচ্চারণের সাথে সাথে গর্বে শরীর শিহরিত ও রোমাঞ্চিত হয়ে উঠে- ওডারল্যান্ড শুধু মামুলি একজন ব্যক্তির নাম নয়- একজন গর্বিত কিংবদন্তি বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম- বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম ও অপরিসীম ভালবাসার জন্য বাঙালি জাতির কাছে তিনি বিশেষভাবে সম্মানিত ও স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব- পুরো নাম ডব্লিউ. এ. এস ওডারল্যান্ড- অর্থাৎ উইলহেলমাস আব্রাহাম সাইমন ওডারল্যান্ড। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সাথে যাঁরা সম্পৃক্ত হয়ে জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাসকে করেছেন গৌরবান্বিত ও মহিমান্বিত- বিদেশি হলেও ওডারল্যান্ড তাঁদেরই একজন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সাহসী ভূমিকা ও সুমহান অবদান রেখে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় জয় করে গেছেন- তাই বঙ্গবন্ধু সরকার তাঁকে মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ও অসামান্য অবদান ও নৈপুণ্যতার কারণে ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব দিয়ে সম্মাননায় ভূষিত করেছেন। বীরপ্রতীক খেতাব-এর তালিকায় তাঁর সিরিয়াল নং ‘৩১৭ ডব্লিউ. এ. এস. ওয়াডারল্যান্ড সেক্টর-২ এফ এফ’ ঠিক এভাবেই এই বীরের নাম লেখা আছে। ওডারল্যান্ড হলেন একমাত্র বিদেশি বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা- তিনি মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত অত্যন্ত গর্বভরে ও শ্রদ্ধার্ঘচিত্তে নামের সঙ্গে ‘বীরপ্রতীক’ খেতাবটি ব্যবহার করতেন অর্থাৎ তাঁর নামের সাথে সবসময় লিখতেন। ডব্লিউ. এ. এস. ওডারল্যান্ড ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর নেদারল্যান্ডের আমস্টারডামে জন্মগ্রহণ করেন- বাংলাদেশের বিজয়ের মাস ডিসেম্বর- আর এই বিজয়ের মাসেই এই বীরের জন্ম -অনেকটা কাকতালীয় ভাবে মিলে যায়। বিজয়ের মাস ডিসেম্বর ৬ বুধবার ২০১৭ তারিখ শততম জন্মদিন উপলক্ষে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ওডারল্যান্ডকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।
ওডারল্যান্ড ঢাকায় বাটা স্যু কোম্পানি (টঙ্গী)-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নেদারল্যান্ডস থেকে ১৯৭০ সালের শেষ দিকে প্রথম ঢাকায় আসেন- কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি নির্বাহী পরিচালক পদে পদোন্নতি লাভ করেন। একাত্তরের পঁচিশে মার্চের বিভীষিকাময় কালরাত্রিতে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির উপর যে বর্বর হামলা চালায়, বিশ্ববাসী স্তম্ভিত হতবাক চিত্তে প্রত্যক্ষ করেছিল ইতিহাসের নৃশংসতম বর্বরতা- ওডারল্যান্ড ঢাকায় অবস্থানকালে নিজ চোখে তা দেখে বিচলিত হয়ে মর্মাহত হয়ে পড়েন- জড়িয়ে পড়েন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে- সরাসরি যুদ্ধ করেছেন হানাদার পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানিদের অত্যাচারের কিছু ছবি তুলে আন্তর্জাতিক পত্র পত্রিকায়ও পাঠিয়ে দেন। তিনি পাকিস্তানি সেনাদের গোপন সংবাদ সংগ্রহ করে গোপনে প্রেরণ করতেন ২নং সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ ও ক্যাপ্টেন এ. টি. এম. হায়দার-এর কাছে। ওডারল্যান্ড মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম. এ. জি ওসমানীর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ও গেরিলা তৎপরতায় সাহায্য করতেন। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে আর্থিক সাহায্য, খাদ্য সরবরাহ ও বাটার জুতা এবং অন্যান্য সামগ্রীও গোপনে পাঠাতেন। ওডারল্যান্ড মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে টঙ্গী-ভৈরব রেললাইনের ব্রীজ, কালভার্ট ধ্বংস করে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করতে থাকেন। তাঁর পরিকল্পনায় ও পরিচালনায় ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে বহু অপারেশন সংঘটিত হয়। স্বাধীনতার এতোবছর পর বীর মুক্তিযোদ্ধা ডব্লিউ. এ. এস ওডারল্যান্ড (বীর প্রতীক) বীরত্বের কথা আত্মবিস্মৃত বাঙালি জাতি কি মনে রেখেছেন!
যেখানে অন্যায় অবিচার সেখানেই ওডারল্যান্ড। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তাঁকে লেখাপড়া ছেড়ে জীবিকার জন্য বের হয়ে যান এবং পরে তিনি বাটা স্যু কোম্পানিতে যোগ দেন। দু’বছর পর চাকরি ছেড়ে ১৯৩৬ সালে জার্মানি কর্তৃক নেদারল্যান্ডস দখলের আগে ওডারল্যান্ড ডাচ ন্যাশনাল সার্ভিসে নাম লেখান। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন- তিনি ছিলেন একজন ওলন্দাজ-অস্ট্রেলিয় সামরিক কমান্ডো অফিসার। পরবর্তীতে তিনি রয়্যাল সিগন্যাল কোরে সার্জেন্ট পদে নিযুক্ত হন এবং ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তিনি উক্ত পদে কর্মরত ছিলেন। এরপর তিনি ওলন্দাজ বাহিনীর গেরিলা কম্যান্ডো হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-১৯৪৫) অংশগ্রহণ করেন। জার্মানি কর্তৃক নেদারল্যান্ড, ফ্রান্স ও বেলজিয়াম দখল করার ফলশ্রুতিতে ওডারল্যান্ডকে গ্রেফতার করা হয়। তবে তিনি বন্দীদশা থেকে পালিয়ে যেতে সমর্থ হন এবং জার্মানী থেকে ফেরত সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেবার কাজে নিযু্ক্ত হন। ওডারল্যান্ড জার্মান ও ডাচ ভাষায় পারদর্শী ছিলেন এবং এর মাধ্যমে তিনি ডাচ আন্ডারগ্রাউন্ড রেজিসট্যান্স মুভমেন্টের হয়ে গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেন।
১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ওডারল্যান্ড-এর সাথে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিযে আমি ব্যক্তিগতভাবে পত্রে যোগাযোগ করি বিশেষ করে একটি বইয়ের জন্য তাঁর একটি বাণী লেখে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করি।

চিঠির উত্তরে অস্ট্রেলিয়া থেকে আমার (লেখকের) কাছে পাঠানো একটি পত্রের এক জায়গায় লিখেছিলেন, “The beauty of being a Freedom Fighter is that we were ‘one-together’ in 1971. My request is for you to be ‘one people’ together under your Prime Minister. If this can be achieved, then our struggle for freedom was successful.”

অস্ট্রেলিয়া থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা ওডারল্যান্ডের পাঠানো চিঠিখানা অস্ট্রেলিয়ার ডাকটিকিট লাগানো সিলসহ খামটি আমার কাছে এখনো সযত্নে সংরক্ষিত আছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কতোটুক আস্থা ও দৃঢ় আত্মবিশ্বাস এবং শ্রদ্ধা থাকলে তিনি এধরণের কথা লিখতে পারেন! প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ওডারল্যান্ডের মৃত্যুতে শোকবার্তা পাঠিয়েছিলেন এবং অস্ট্রেলিয়াতে ওডারল্যান্ডের সমাধিতে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছেন।

CONDOLENCE MESSAGE FROM THE PRIME MINISTER OF BANGLADESH AND OTHERS
________________________________________

Quote:

Mrs. Ouderalnd
5 Peet Crescent
Trigg
Perth, WA-6029
Australia
Dear Mrs. Ouderland,
22 May 2001

I was deeply grieved to learn of the sad demise of your illustrious husband Mr. W.A.S. Ouderland, Bir Pratik. Please accept, on my own behalf and on behalf of the Government and the people of Bangladesh, our deepest condolences.
Your late husband has been a legend in our country by having the rare distinction of valiantly fighting shoulder to shoulder with our freedom-fighters during Bangladesh’s War of Independence in 1971 and being the only foreign national to have been honoured with the gallantry award ‘Bir Pratik’. By this he has created for himself a niche in the hearts of the Bengali nation.
May God give you and the rest of your family members the strength and the courage to bear this irreparable loss. We pray for the salvation of the departed soul.

(Sheikh Hasina)

১৯৯৮ সালের ৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও সনদপত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে ওডারল্যান্ডকে আমন্ত্রণ জানান- কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি। ওডারল্যান্ড বীর প্রতীক পদকের সম্মানী ১০,০০০(দশ হাজার) টাকা মুক্তিযোদ্ধা কল্যান ট্রাস্টে দান করে দেন।
২০০১ সালের ১৮ মে তারিখে ওডারল্যান্ড ৮৪ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে মৃত্যুবরণ করেন। ওডারল্যান্ড-এর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর স্ত্রী মারিয়ার কাছে শোকবার্তা পাঠান। ওডারল্যান্ড-এর কফিন বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলীয় জাতীয় পতাকা দিয়ে আচ্ছাদিত করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্মান প্রদর্শন করা হয়। পার্থে বসবাসরত প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধারা ওডারল্যান্ড-এর উদ্দেশ্যে সামরিক কায়দায় গার্ড অব অনার প্রদান করেন। ২০১১ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অস্ট্রেলিয়ার পার্থে ২১তম কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দেন এবং তিনি সম্মেলনের মাঝে সময় করে এই মহান বীরের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
বর্তমানে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ওডারল্যান্ড (বীর প্রতীক)-এর রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতা কে পাচ্ছেন? খেতাবপ্রাপ্ত একমাত্র বিদেশি বীর মুক্তিযোদ্ধা ওডারল্যান্ড(বীর প্রতীক)-এর রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতা বকেয়াসহ তাঁর পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এবং মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর মুক্তিয়োদ্ধা আ.ক.ম মোজাম্মেল হক-এর কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি। সবচে মজার ব্যাপার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মন্ত্রী বীর মুক্তিয়োদ্ধা আ.ক.ম মোজাম্মেল হক স্বাধীনতার পরপর নিজ হাতে ডব্লিউ. এ. এস ওডারল্যান্ড (বীর প্রতীক)-কে মুক্তিযোদ্ধার সাময়িক সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন।
ডব্লিউ. এ. এস ওডারল্যান্ড (বীর প্রতীক) টঙ্গীর বাটা সু কোম্পানিতে চাকরী করতেন- তাই মাননীয় মন্ত্রী বীর মুক্তিয়োদ্ধা আ.ক.ম মোজাম্মেল হক-এর নির্বাচনী এলাকা টঙ্গীতে ওডারল্যান্ড-এর মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্টেনগানসহ একটি ছবি আছে- সে ছবির সাথে মিল রেখে সে অনুযায়ী টঙ্গীতে তাঁর একটি ভাস্কর্য্য নির্মাণ করা হোক এবং বাটা স্যু কোম্পানিকে ভাস্কর্যের সম্পূর্ণ খরচ বহন করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হোক এবং সেটা হবে দেশের সর্বোচ্চ ভাস্কর্য্য এবং বাটা স্যু কোম্পানি আশা করি এই অনুরোধ সাদরে গ্রহণ করবেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ ঢাকার গুলশানের একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে। বীর প্রতীক ওডারল্যান্ড-এর প্রতি সম্মান জানিয়ে ক্যানবেরায় বাংলাদেশ হাই কমিশন তাঁর নামে একটি মিলনায়তন ও গ্রন্থাগারের নামকরণ করেছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা ডব্লিউ. এ. এস ওডারল্যান্ড (বীর প্রতীক)-এর শততম জন্মদিন উপলক্ষে পরম শ্রদ্ধার সাথে তাঁকে স্মরণ করছি এবং বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা; ২ নং সেক্টর, বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

 

0 Comments

Leave a Comment

সব খবর (সব প্রকাশিত)

লক্ষ্য করুন

প্রবাসের আরো খবর কিংবা অন্য যে কোন খবর অথবা লেখালেখি ইত্যাদি খুঁজতে উপরে মেনুতে গিয়ে আপনার কাংখিত অংশে ক্লিক করুন। অথবা ‌উপরেরর মেনু'র সর্বডানে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন এবং আপনার খবর বা লেখার হেডিং এর একটি শব্দ ইউনিকোড ফন্টে টাইপ করে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ।