Feb 24, 2018

ছবিতে যশোহর রোড এবং অ্যালেন গিন্সবার্গ

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্তিম বন্ধু ও কলমযোদ্ধা মানবতাবাদী আমেরিকান কবি ও গীতিকার অ্যালেন গিন্সবার্গ- পুরো নাম আরউইন অ্যালেন গিন্সবার্গ- যাঁর নাম উচ্চারণের সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের চাক্ষুষ ঘটনার মর্মস্পর্ষী চিত্র নিয়ে রচিত তাঁর বিখ্যাত ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ অশ্রুঝরা কবিতা বা গানটির কথা মনে পড়ে যায় এবং কবিতাটি পড়লে বর্বর পাকিস্তানিদের নির্মম নৃশংস গণহত্যার চিত্র যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে- আমরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি এবং এখনো শরীর শিহরিত ও রোমাঞ্চিত হয়ে উঠে- চোখ ভিজে যায় এবং মন মুহূর্তেই চলে যায় সেই মহান মুক্তিযুদ্ধের একাত্তরের রণাঙ্গনে। ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি পড়ে বা গানটি শোনে রক্তমাংসে গড়া যে কোনো হৃদয়বান ব্যক্তির চোখ ভিজে আসবে। দীর্ঘ ১৫২ লাইনের চোখের জলে লেখা মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি নিয়ে কালজয়ী কবিতাটির পংক্তিমালাগুলো এখনো জীবন্ত- যা শুধু কবিতা না বলে একটি ‘অশ্রুঝরা অমর মহাকাব্য’ বলা যায়।
বাংলাদেশের পরম বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ৩ জুন ১৯২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৯৭ সালের ৫ এপ্রিল নিউইয়র্কে পরলোকগমন করেন- কিন্তু রেখে যান একাত্তরে হানাদার পাকিস্তানিদের বর্বরতার চিহ্নের সময়ের নিরব সাক্ষী তাঁর অমর কাব্য ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা মানবতার মূর্ত প্রতীক অ্যালেন গিন্সবার্গকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মরণ করছি।
এই বিখ্যাত কবিতাটি বাংলায় ভাষান্তর করেন খান মোহাম্মদ ফারাবী- যা পড়লে চোখে পানি আটকিয়ে রাখা যায় না। দুই বাংলার জনপ্রিয় প্রখ্যাত গায়িকা মৌসুমি ভৌমিক অত্যন্ত আগ্রহ ও আন্তরিকতার সাথে এই বাংলা কবিতার ভাবানুবাদ করেন এবং করুণ সুরারোপ করে গানাকারে নিয়ে আসেন- মৌসুমি ভৌমিকের কণ্ঠে করুণ সুরে মর্মস্পর্শী এই গানটি শুনলে হৃদয় ছুঁয়ে মন ভারাক্রান্ত হয়ে চোখ ভিজে আসে। হৃদয়স্পর্শ করা গানটি নিচে দেয়া হলো-

‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ -অ্যালেন গিন্সবার্গ
“শত শত চোখ আকাশটা দেখে
শত শত শত মানুষের দল
যশোর রোডের দু’ধারে বসত
বাঁশের ছাউনি, কাদামাটি জল
কাদামাটি মাখা মানুষের দল
গাদাগাদি হয়ে আকাশটা দেখে
আকাশে বসত মরা ঈশ্বর
নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে
ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে
যুদ্ধে ছিন্ন ঘরবাড়ি দেশ
মাথার ভিতরে বোমারু বিমান
এই কাল রাত কবে হবে শেষ
শত শত মুখ হায় একাত্তর
যশোর রোড যে কত কথা বলে
এত মরা মুখ আধ মরা পায়ে
পূর্ববাংলা কোলকাতা চলে
সময় চলেছে রাজপথ ধরে
যশোর রোডেতে মানুষ মিছিল
সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর
গরুগাড়ি কাদা রাস্তা পিছিল
লক্ষ মানুষ ভাত চেয়ে মরে
লক্ষ মানুষ শোকে ভেসে যায়
ঘরহীন ভাসে শত শত লোক
লক্ষ জননী পাগলের প্রায়
রিফিউজি ঘরে খিদে পাওয়া শিশু
পেটগুলো সব ফুলে ফেঁপে ওঠে
এইটুকু শিশু এতবড় চোখ
দিশেহারা মা কার কাছে ছোটে
সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর
এতো এতো শুধু মানুষের মুখ
যুদ্ধ মৃত্যু তবুও স্বপ্ন
ফসলের মাঠ ফেলে আসা সুখ
কার কাছে বলি ভাত রুটি কথা
কাকে বলি কর কর কর ত্রাণ
কাকে বলি ওগো মৃত্যু থামাও
মরে যাওয়া বুকে এনে দাও প্রাণ
কাঁদো কাঁদো তুমি মানুষের দল
তোমার শরীর ক্ষত দিয়ে ঢাকা
জননীর কোলে আধপেটা শিশু
এ কেমন বাঁচা, বেঁচে মরে থাকা
ছোট ছোট তুমি মানুষের দল
তোমার ঘরেও মৃত্যুর ছায়া
গুলিতে ছিন্ন দেহ-মন-মাটি
ঘর ছেড়েছো তো মাটি মিছে মায়া
সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর
ঘর ভেঙ্গে গেছে যুদ্ধের ঝড়ে
যশোর রোডের দু’ধারে মানুষ
এত এত লোক শুধু কেন মরে
শত শত চোখ আকাশটা দেখে
শত শত শত শিশু মরে গেল
যশোর রোডের যুদ্ধক্ষেত্রে
ছেঁড়া সংসার সব এলোমেলো
কাদামাটি মাখা মানুষের দল
গাদাগাদি হয়ে আকাশটা দেখে
আকাশে বসত মরা ঈশ্বর
নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে
ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে
যুদ্ধে ছিন্ন ঘর-বাড়ি-দেশ
মাথার ভিতরে বোমারু বিমান
এই কালো রাত কবে হবে শেষ
শত শত মুখ হায় একাত্তর
যশোর রোড যে কত কথা বলে
এত মরা মুখ আধ মরা পায়ে
পূর্ববাংলা কোলকাতা চলে
এত মরা মুখ আধ মরা পায়ে
পূর্ববাংলা কোলকাতা চলে।”

September on Jessore Road – Poem/Song by Allen Ginsberg
“Millions of babies watching the skies
Bellies swollen, with big round eyes
On Jessore Road -long bamboo huts
No place to shit but sand channel ruts

Millions of fathers in rain
Millions of mothers in pain
Millions of brothers in woe
Millions of sisters nowhere to go

One Million aunts are dying for bread
One Million uncles lamenting the dead
Grandfather millions homeless and sad
Grandmother millions silently mad

Millions of daughters walk in the mud
Millions of children wash in the flood
A Million girls vomit & groan
Millions of families hopeless alone

Millions of souls nineteen seventy one
homeless on Jessore road under grey sun
A million are dead, the millions who can
Walk toward Calcutta from East Pakistan

Taxi September along Jessore Road
Oxcart skeletons drag charcoal load
past watery fields thru rain flood ruts
Dung cakes on tree trunks, plastic-roof huts

Wet processions Families walk
Stunted boys big heads don’t talk
Look bony skulls & silent round eyes
Starving black angels in human disguise

Mother squats weeping & points to her sons
Standing thin legged like elderly nuns
small bodied hands to their mouths in prayer
Five months small food since they settled there

on one floor mat with small empty pot
Father lifts up his hands at their lot
Tears come to their mother’s eye
Pain makes mother Maya cry

Two children together in palm roof shade
Stare at me no word is said
Rice ration, lentils one time a week
Milk powder for war weary infants meek

No vegetable money or work for the man
Rice lasts four days eat while they can
Then children starve three days in a row
and vomit their next food unless they eat slow.

On Jessore road Mother wept at my knees
Bengali tongue cried mister Please
Identity card torn up on the floor
Husband still waits at the camp office door

Baby at play I was washing the flood
Now they won’t give us any more food
The pieces are here in my celluloid purse
Innocent baby play our death curse

Two policemen surrounded by thousands of boys
Crowded waiting their daily bread joys
Carry big whistles & long bamboo sticks
to whack them in line They play hungry tricks

Breaking the line and jumping in front
Into the circle sneaks one skinny runt
Two brothers dance forward on the mud stage
The guards blow their whistles & chase them in rage

Why are these infants massed in this place
Laughing in play & pushing for space
Why do they wait here so cheerful & dread
Why this is the House where they give children bread

The man in the bread door Cries & comes out
Thousands of boys and girls Take up his shout
Is it joy? Is it prayer? “No more bread today”
Thousands of Children at once scream “Hooray!”

Run home to tents where elders await
Messenger children with bread from the state
No bread more today! & and no place to squat
Painful baby, sick shit he has got.

Malnutrition skulls thousands for months
Dysentery drains bowels all at once
Nurse shows disease card Enter strep
Suspension is wanting or else chlorostrep

Refugee camps in hospital shacks
Newborn lay naked on mother’s thin laps
Monkey sized week old Rheumatic babe eye
Gastroenteritis Blood Poison thousands must die

September Jessore Road rickshaw
50,000 souls in one camp I saw
Rows of bamboo huts in the flood
Open drains, & wet families waiting for food

Border trucks flooded, food can’t get past,
American Angel machine please come fast!
Where is Ambassador Bunker today?
Are his Helios machine-gunning children at play?

Where are the helicopters of U.S. AID?
Smuggling dope in Bangkok’s green shade.
Where is America’s Air Force of Light?
Bombing North Laos all day and all night?

Where are the President’s Armies of Gold?
Billionaire Navies merciful Bold?
Bringing us medicine food and relief?
Napalming North Viet Nam and causing more grief?

Where are our tears? Who weeps for the pain?
Where can these families go in the rain?
Jessore Road’s children close their big eyes
where will we sleep when Our Father dies?

Whom shall we pray to for rice and for care?
Who can bring bread to this shit flood fouled lair?
Millions of children alone in the rain!
Millions of children weeping in pain!

Ring O ye tongues of the world for their woe
Ring out ye voices for Love we don’t know
Ring out ye bells of electrical pain
Ring in the conscious of America brain

How many children are we who are lost
Whose are these daughters we see turn to ghost?
What are our souls that we have lost care?
Ring out ye music’s and weep if you dare-

Cries in the mud by the thatched house sand drain
Sleeps in huge pipes in the wet shit-field rain
waits by the pump well, Woe to the world!
Whose children still starve in their mother’s arms curled?

Is this what I did to myself in the past?
What shall I do Sunil Poet I asked?
Move on and leave them without any coins?
What should I care for the love of my loins?

What should we care for our cities and cars?
What shall we buy with our Food Stamps on Mars?
How many millions sit down in New York
& sup this night’s table on bone & roast pork?

How many millions of beer cans are tossed
in Oceans of Mother? How much does she cost?
Cigar gasoline’s and asphalt car dreams
Stinking the world and dimming star beams-

Finish the war in your breast with a sigh
Come tats the tears in your own Human eye
Pity us millions of phantoms you see
Starved in Samara on planet TV

How many millions of children die more
before our Good Mothers perceive the Great Lord?
How many good fathers pay tax to rebuild
Armed forces that boast the children they’ve killed?

How many souls walk through Maya in pain
How many babes in illusory pain?
How many families hollow eyed lost?
How many grandmothers turning to ghost?

How many loves who never get bread?
How many Aunts with holes in their head?
How many sisters’ skulls on the ground?
How many grandfathers make no more sound?

How many fathers in woe
How many sons nowhere to go?
How many daughters nothing to eat?
How many uncles with swollen sick feet?

Millions of babies in pain
Millions of mothers in rain
Millions of brothers in woe
Millions of children nowhere to go.”

যেখানে অন্যায়-অবিচার-অত্যাচার এবং মানবতা পদদলিত সেখানেই প্রতিবাদী কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের কলম ঝলসে উঠে ও কলম দিয়ে অগ্নি-স্ফূলিঙ্গ বের হয়। একাত্তরে বাংলাদেশে হানাদার বর্বর নরপশু নারীধর্ষক পাকিস্তানিদের নির্বিচারে গণহত্যা এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়া লক্ষ লক্ষ শরণার্থীদের দুর্দশার খবর এই মানবতা দরদী কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের কানেও পৌঁছে যায় ও তাঁর হৃদয় কেঁপে উঠে এবং তিনি সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে শরণার্থীদের জন্য সাথে সংগ্রহ করা কিছু আর্থিক সাহায্য নিয়ে নিজের চোখে দেখার জন্য ছুটে আসেন এবং ওপার বাংলার সাহিত্যিক-কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে সীমান্তের শরণার্থীদের দুর্দশা দেখার জন্য শরণার্থী ক্যাম্পে চলে আসেন।
যশোর রোড- যা বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার মধ্যে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকারী রোড। বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ শরণার্থী পশ্চিম বাংলা ও সীমান্তবর্তী অন্যান্য স্থানে বিশেষ করে যশোর রোডে আশ্রয় নিয়েছিল। প্রচুর বৃষ্টি ও বন্যায় তখন যশোর রোড পানিতে ডুবে গিয়েছিল- তারপরও গিন্সবার্গ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে নৌকায় করে বনগাঁ পেরিয়ে বাংলাদেশের যশোর সীমান্তে পৌঁছে সীমান্ত ও এর আশপাশের শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের সীমাহীন দুর্দশা প্রত্যক্ষ করে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা তাঁর হৃদয়কে স্পর্শ করে। হানাদার নরপশু বর্বর পাকিস্তানি হায়েনাদের বিরুদ্ধে প্রাণপণে লড়ার জন্য আমরা হাতে তুলে নিয়েছিলাম অস্ত্র আর জনপ্রিয় মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ নিয়েছিলেন কলম- মানুষের এই অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট, হাহাকার দেখে গিন্সবার্গ ভীষণ মর্মাহত হন। নিজের চোখে দেখা দুঃস্বপ্নের মতো তাঁর এই স্মৃতি বিশ্ববাসী ও যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিআকর্ষণের জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসেই অসভ্য পাকিস্তানিদের চরম ধিক্কার জানিয়ে লিখলেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে পাকিস্তানিদের বর্বরোচিত আচরণ বা ঘটনার আড়ালে যারা ইন্ধন দিয়ে এই অসভ্য বর্বর পাকিস্তানকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করছে- তাদের মুখোশ উন্মোচন করে দেওয়া। ১৫২ লাইনের অশ্রু দিয়ে লেখা দীর্ঘ কবিতাটি পরবর্তীতে ‘দি নিউইয়র্ক টাইমস’-এ প্রকাশিত হলে সারা বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া বাংলাদেশে বর্বর পাকিস্তানিদের নির্মম নৃশংস গণহত্যার খবর পড়ে হতবাক স্তম্ভিত হয়ে বিশ্ব মানবতা এবং গণহত্যাকারী পাকিস্তানকে ধিক্কার জানাতে থাকে।
অ্যালেন গিন্সবার্গ তীব্র উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠা নিয়ে তাঁর বন্ধু প্রখ্যাত গায়ক জন লেননকে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি পড়ে শোনান- কবিতা পাঠ শেষে গিন্সবার্গ লক্ষ্য করলেন জন লেননের চোখে অশ্রু- তখনই তিনি বুঝতে পারলেন তার এই কবিতাটি লেখা সার্থক হয়েছে। অশ্রসিক্ত নয়নে জন লেনন তখনই গিন্সবার্গকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাকে গানে রূপ দেওয়ার জন্য।
‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি নিউইয়র্ক এর সেন্ট জর্জ চার্চ-এ একটি কবিতা আবৃত্তি অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করা হয় এবং বেশ প্রশংসিত হয়। গিন্সবার্গ তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু সংগীত শিল্পী পপ তারকা বব ডিলান ও অন্যান্য বিখ্যাত গায়কদের সহায়তায় কনসার্ট আয়োজন করে বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। বব ডিলানের উদ্যোগে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’-এর গান হয়ে ওঠার প্রয়াস চলে এবং কণ্ঠ ছিল গিন্সবার্গের- গিটারে ছিলেন বব ডিলান নিজেই।
অবশেষে প্রখ্যাত গায়ক জন লেননের পরামর্শ মেনে গিন্সবার্গ গানটি রেকর্ড আকারে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন।
অ্যালেন গিন্সবার্গ তার বিখ্যাত কবিতা ‘হাউল’ রচনা করে সবচেয়ে বেশি খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি এই কবিতাটি লিখেছিলেন তার বিট প্রজন্মের বন্ধুদের বরণ করে নিয়ে- এই কবিতা তাকে এবং তাঁর বন্ধুদেরকে অনেক খ্যাতি এনে দিয়েছিল। ১৯৬০ সালে গিন্সবার্গ ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। লেখক-কবি-সাহিত্যিক গিন্সবার্গের বই ‘দি ফল অব আমেরিকা’ ১৯৭৪ সালে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড এবং তিনি ১৯৭৯ সালে ‘ন্যাশনাল আর্টস ক্লাব’ থেকে স্বর্ণ পদক লাভ করেন। তিনি রবার্ট ফ্রোস্ট মেডেল পান ১৯৮৬ সালে। ১৯৯৫ সালে তার বই ‘কসমোপলিটান গ্রেটিংস: পয়েমস ১৯৮৬-১৯৯২’ পুলিৎজার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল।
গিন্সবার্গ ১৯৮৬ সাল থেকে তিনি আমৃত্যু ব্রুকলিন কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসাবে কাব্য পড়াতেন। গিন্সবার্গ বৌদ্ধ ধর্ম চর্চা করতেন এবং প্রাচ্যদেশীয় ধর্ম ব্যাপকভাবে অধ্যয়ন করেছেন। তিনি খুবই সাধারণ জীবন-যাপনে বিশ্বাসী ছিলেন এবং অহিংস বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অংশীদার লেখক-কবি-সাহিত্যিক গিন্সবার্গ-এর কাছে পুরো বাঙালি জাতি ঋণী- কারণ তিনি চিরকৃতজ্ঞতার বন্ধনে আমাদের আবদ্ধ করেছেন। একাত্তরে হিংস্র হায়েনা পাকিস্তানি বাহিনী যখন বাংলাদেশে গণহত্যা, নারীধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের উল্লাসে মেতে উঠেছিল- তখন গিন্সবার্গ বাংলার স্বাধীনতাকামী, নিপীড়িত, শোষিত, লাঞ্ছিত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে যতজন বিদেশী বন্ধু বাংলাদেশিদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই মহানুভব কবি। বাংলাদেশ সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কবি অ্যালেন গিনসবার্গকে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা দিয়ে সম্মানিত করেছেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্তিম বন্ধু কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের অশ্রুঝরা অমর কাব্য দীর্ঘ ১৫২ লাইনের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ শিরোনামে কবিতাটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার পাকিস্তানিদের বর্বরতার চিহ্নের নৃশংসতার এক ভয়াবহ দৃশ্যের চিত্র- যা নিরব সাক্ষী হয়ে বাংলাদশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি নিয়ে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কালজয়ী কবিতাটি স্বাধীনতার এতো বছর পরও কি বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্তি হতে পারে না? এ ব্যাপারে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের আশু দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক যশোর রোডের মাত্র পাঁচ মিটার সম্প্রসারণের জন্য শতবর্ষী ২ হাজার ৩১২টি গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে- যারা এরকম নির্মম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাদের সম্পর্কে আর বলার কিছুই নাই- নিয়তির কাছে শুধু এটুকুই বলবো, ‘রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি!’ অথচ ওপার বাংলায় যশোর রোডের ঐতিহাসিক শতবর্ষী গাছগুলো রেখেই রাস্তা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ যদি আজ বেঁচে থাকতেন তিনি আবার যশোর রোডে ফিরে আসতেন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নিরব সাক্ষী শতবর্ষী গাছগুলোর রক্ষার জন্য আবার অশ্রুঝরা কবিতা লিখতেন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজরিত ঐতিহাসিক যশোর রোডের শতবর্ষী গাছগুলো রক্ষার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আশু সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি- ২ হাজার ৩১২টি শতবর্ষী গাছগুলোকে রক্ষা করে বঙ্গবন্ধু কন্যা আপনি বিশ্বকে আবারো দেখিয়ে দিন আপনি শুধু ‘মাদার অব হিউমিনিটি’ নন আপনি ‘মাদার অব এ্যানভার্নমেন্ট’।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা; ২ নং সেক্টর, বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

 

2 Comments

সাঈদ, মুক্তিযোদ্ধা January 16, 2018 at 1:59 pm

মহান ব্যক্তিত্বের এই অমর গাথা প্রধান মন্ত্রীর গোচরে কেহ নিবেন কি? যদি তার নজরে আসে তবে হয়তো বা জাতীয় স্বার্থের এই প্রকল্পের নতুন সংস্করন হতে পারে।

Farouk Waheed January 16, 2018 at 2:39 pm

সাঈদ, মুক্তিযোদ্ধা, ভাই অনেক ধন্যবাদ।

Leave a Comment

বিজ্ঞাপন

পাঠকের মন্তব্য

বিজ্ঞাপন

লক্ষ্য করুন

প্রবাসের আরো খবর কিংবা অন্য যে কোন খবর অথবা লেখালেখি ইত্যাদি খুঁজতে উপরে মেনুতে গিয়ে আপনার কাংখিত অংশে ক্লিক করুন। অথবা ‌উপরেরর মেনু'র সর্বডানে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন এবং আপনার খবর বা লেখার হেডিং এর একটি শব্দ ইউনিকোড ফন্টে টাইপ করে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন।
ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন