Feb 24, 2018

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্র্যাম্পের আমলে প্রতিরক্ষানীতি অভিজ্ঞতা-নির্ভর মনে হচ্ছেনা। আমেরিকাকে ব্যর্থ করার পদক্ষেপগুলো আমেরিকার তো বটেই,বিশ্বস্থিতিশীলতার পক্ষেও ক্ষতিকর।আফগানিস্তানে তফসিরি সন্ত্রাসীদের পাঠিয়ে কৃত্রিম সন্ত্রাস দেখানোর প্রদর্শনী করাচ্ছেন।আবার তাদেরকে দমনের নামে আমেরিকান সেনাবাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতির বোঝা বাড়ানোর সঙ্গতিহীন যুক্তি নিয়েও তার প্রতিরক্ষা নীতির সমালোচনা বাড়ছে। ইওরোপের মিত্রদেরকে তিনি চটিয়ে রাশিয়া ও ইরানের পক্ষে ঠেলে দিয়ে আমেরিকার জন্যে বিপদের কারণ হচ্ছেন।

রাশিয়ার পশ্চিম সীমান্তবর্তী এস্তোনিয়া,লিথুয়ানিয়া লাটভিয়া ও পোল্যান্ডে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মার্কিণ নেতৃত্বাধীন জোট প্রায় ৪,০০০ সৈন্য মোতায়েন করেছে।রশিয়া নিজের নাকের ডগায় পাশ্চাত্যের এই সেনা মোতায়েন দেখে উদ্বেগ করেছে। তারই জের ধরে প্রতিরক্ষার জন্যে কালিননগ্রাদে পরমানু অস্ত্র বহনে সক্ষম ইস্কান্দার ক্ষেপনাস্ত্র মোতায়েন করেছে।এই ক্ষেপনাস্ত্র ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে আঘাত হানতে প্রচলিত বা অপ্রচিলিত ওয়ারহেড বহনে সক্ষম। রুশ পার্লামেণ্টের প্রতিরক্ষা বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান শামানোভ বলেছেন,ইস্কান্দার ক্ষেপনাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু বিদেশী সামরিক স্থাপনা।স্থানীয় কারো বিরুদ্ধে নয়।ঐ অঞ্চলে মার্কিণ সেনাশক্তির মোকাবেলার জন্যে আরো কয়েকবার এই ক্ষেপনাস্ত্র মোতায়েন করার রেকর্ড আছে।

এদিকে মার্কিণ-ইজরাইলী বলয়ের বিপরীতে একটি শক্তিশালী একই আদর্শের জোট যুদ্ধ ও প্রতিরোধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে বলে ইরানের দাবি।ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী আকবার বেলায়েতি বলেন,ইরান,সিরিয়া,ইরাক,লেবানন ও ইয়েমেনের ঐক্যে মধ্যপ্রাচ্যে একটি প্রকৃত জোটের উত্থান ঘটেছে।ইরাক ও সিরিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্যে উগ্র তাফসিরি সন্ত্রাসীবাহিনী-দায়েশ ছেড়ে দিয়েও তাদের টিকিয়ে রাখতে পারেনি আমেরিকা ইসরাইলী পৃষ্ঠপোষকরা।

ওখানে এই নিজের গড়া সন্ত্রাসীদেরকে দমনের অজুহাত দেখিয়ে আমেরিকান বাহিনী ওখানে উপস্থিতি দেখায়,যুদ্ধ করে। ওখানে নিজেদের সেবাদাসদের উৎখাত হওয়া দেখে নিজেরা সৈন্য গুটিয়ে নিয়ে তাদেরকে আফগানিস্তানে স্থানান্তর করার ক্ষেত্র তৈরী করা হলো দায়েশদেরকে আফগানিস্তানে পাঠিয়ে দিয়ে নয়া উৎপাত দেখানোর পরিবেশে।ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে,দায়েশ দমনের জন্যেই নাকি আফগানিস্তানে মার্কিণ সৈন্য বাড়ানো হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন,চীন রাশিয়া ইরান পাকিস্তানের চাপ ঠেকাতে আফগানিস্তানে সৈন্যসংখ্যা দ্বিগুণ করা হয়েছে।

এই নয়া পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে ফোনে কথা বলেছেন ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী তারেক শাহ বাহ্‌রামি।তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন,আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পুরো অঞ্চলের দেশগুলোর উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমরা আফগানিস্তানকে নিরাপদ দেখতে চাই।বিদেশী সৈন্যের উৎপাত সরিয়ে দিয়ে।আফগানিস্তানে অস্থিতিশীল ও নৈরাজ্যের এই চার দশক হচ্ছে জোর করে বিদেশী দখলদারিত্ব বজায়ের প্রতিযোগীতার কারণে।প্রতিবেশী বিশেষ করে সীমান্তের সাথের দেশগুলোয় অসুবিধা ছড়াচ্ছে আফগানিস্তানে অস্থিতিশীলতার প্রভাবে। সাম্প্রতিক সময়ে দায়েশের উৎপাত বেড়ে গেছে।আমেরিকা নিজের সেনাঅবস্থান দীর্ঘস্থায়ী করার পরিকল্পিত লক্ষ্যেই দায়েশকে দিয়ে অস্থিরতা সক্রিয় করেছে।এতে আফগানিস্তানের নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনী ফিকাহ শাস্ত্র সংক্রান্ত উচ্চতর শ্রেনীর ছাত্রদের উদ্দেশ্যে ভাষণে বলেছেন,যারা দায়েশ সৃষ্টি করে সেটাকে সিরিয়া ও ইরাকের জনগণের উপর জুলুম ও নির্যাতনের লক্ষ্যে অপব্যবহার করেছে তারাই বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে পরাজিত হয়েছে এবং দায়েশকে আফগানিস্তানে সরিয়ে নিচ্ছে।তিনি জোর দিয়ে বলেন,মার্কিণ সমর্থিত সন্ত্রাসীদের কাছে শিয়া সুন্নীর কোন প্রার্থক্য নেই। শিয়া সুন্নি সহ বেসামরিক মানুষই হচ্ছে তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু।

আফগানিস্তানের শান্তি ও স্থিতিশীলতার দিকে মার্কিণ-বিরোধী জোটের বিশেষ নজর কেন্দ্রীভূত।যে সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প আফগানিস্তানে সৈন্যশক্তি সরবরাহকে অগ্রাধিকারে নিয়েছেন,একই সময় যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধশক্তি নিয়োগের কথা না বলে ইরান আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতার উপর গুরুত্ব আরোপ করে চলেছে।আফগানপ্রতিরক্ষামন্ত্রী ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কথার জবাবে বলেছেন সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে অর্থাৎ কাবুল ও তেহরানের উচিত হবেনা অভিন্ন শত্রুর ব্যাপারে উদাসীন থাকা।নিরাপত্তাহীনতা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা নির্ভর করছে অনেক ধরনের ফ্যাক্টরের উপর।তবে বিদেশী হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কের আন্তরিকতা ও সহযোগীতা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে। তিনি আরো বলেন,বর্তমানে আফগানিস্তানে ২০হাজার সন্ত্রাসীর তৎপরতা রয়েছে।এদের উপর দেশ ছেড়ে দিলে সমগ্র অঞ্চলই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে।এই পরিস্থিতিতে তার কথার পিঠে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন,আফগানিস্তানের নিরাপত্তাকে ইরান নিজের নিরাপত্তা বলে মনে করে এবং আফগানিস্তান সরকারের পাশে থেকে আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতার জন্যে লড়তে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো,পেন্টাগণ তার প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে,পাকিস্তানে ভবিষ্যতে চীনের ঘঁটি নির্মানের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।জিবুতিতে চীনাঘাঁটির স্থাপনের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে ভারত মহাসয়াগরের উওত্তর পশ্চিমাঞ্চলে এটি চীনের বিদেশে প্রথম ঘাঁটি।চীনের মুক্তামালার অংশ হয়ে উঠতে পারে এই ঘাঁটি।সামরিক মিত্রতা ও সম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমে ভারতকে ঘিরে ফেলার কাজে এই ঘাঁটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।বাংলাদেশ,শ্রীলংকা ও বার্মা এই মুক্তামালার অংশ বলে ধারণা করা হয়।

পেন্টাগনের এই বিবৃতি এসেছে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাশক্তি দ্বিগুণ করার খবর বের হবার পরপর। বার্তা সংস্থা এপি সংবাদ দিয়েছে, ইরাক সরকারের মুখপাত্র সা’দ আল হাদিসি বলেছেন,কিছুদিন আগেই ইরাক থেকে মার্কিণ সেনা প্রত্যাহার চালু হয়েছে।ইরাকে দায়েশের পতনের পরই আমেরিকা ইরাকের সাথে চুক্তি সাক্ষরের মাধ্যমে এই প্রত্যাহার শুরু করেছে। ২০১৭সালের গোড়ায় সাড়ে আট হাজার মার্কিণ সৈন্য ছিলো আফগানিস্তানে।বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ১৪হাজার।

পেণ্টাগণ আরেকটা বিবৃতিতে বলেছে, অদূর ভবিষ্যতে ইরাক থেকে মার্কিণ সেনা প্রত্যাহারের কোন পরিকল্পনা নেই। ইরাকি সেনা প্রশিক্ষণের জন্যে আমেরিকান সৈন্যের ইরাকে অবস্থান দরকার।অতিরিক্ত মেয়াদে মার্কিণ সেনা ইরাকে রাখার ব্যাপারে উভয় দেশের চুক্তি হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

পেন্টাগনের এই বিবৃতিগুলো প্রেসিডেণ্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিন্তাধারার প্রভাব দেখা যায়।এই চিন্তাধারার সাথে আমেরিকার মাথা উঁচু করে থাকার চেহারা ঠিক মতো ফুটে উঠছেনা।যদিও মার্কিণ সৈন্যের অবস্থান বাড়ানো ছাড়া ট্রাম্প নীতিতে আর কোন চয়েস আপাততঃ নেই।

 

(লেখক আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক ও মুক্তিযোদ্ধা)

0 Comments

Leave a Comment

বিজ্ঞাপন

পাঠকের মন্তব্য

বিজ্ঞাপন

লক্ষ্য করুন

প্রবাসের আরো খবর কিংবা অন্য যে কোন খবর অথবা লেখালেখি ইত্যাদি খুঁজতে উপরে মেনুতে গিয়ে আপনার কাংখিত অংশে ক্লিক করুন। অথবা ‌উপরেরর মেনু'র সর্বডানে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন এবং আপনার খবর বা লেখার হেডিং এর একটি শব্দ ইউনিকোড ফন্টে টাইপ করে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন।
ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন