Feb 24, 2018

ভালোবাসার ঋতু ঋতুরাজ বসন্ত স্মরণে: ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ ভালোবাসার ঋতু ঋতুরাজ বসন্ত- এ যেন “আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে”। ভালোবাসার ঋতু বলেইতো বসন্ত ভালোবাসতে শেখায়। “মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে”- হিমশীতল শীতকন্যাকে বিদায় দিয়ে ফাগুনের রং প্রকৃতি ও মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে- বসন্তদূত কোকিলের কুহুতানে ভালোবাসার শুভবার্তা নিয়ে জয়ের মালা গেঁথে এই বাংলায় ঋতুরাজ বসন্তের রাজসিক আগমন ঘটে। ঋতুরাজ বসন্তের দূত হল ফুল আর পাখি। আর তাইতো কবি গুরু গেয়ে উঠেন-“আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে,/ এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়।।” “আজি দক্ষিণ-দুয়ার খোলা/ এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো।”
“একটুকু ছোঁওয়া লাগে, একটুকু কথা শুনি-/ তাই দিয়ে মনে মনে রচি মম ফাল্গুনী।।/ কিছু পলাশের নেশা, কিছু বা চাঁপার মেশা,/ তাই দিয়ে সুরে সুরে রঙে রসে জাল বুনি।।” “কে রঙ লাগালো বনে বনে।/ ঢেউ জাগালে সমীরণে।।” প্রকৃতি আজ প্রেমোন্মুখ, মনেতে ফাগুন এলো রঙ ছড়িয়ে। “ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে।” এ বসন্তে “কী যেন কীসের লাগি প্রাণ করে হায় হায়!” শুধু তাই নয়- হৃদয়ে লাগে হৃদয়ের দোলা, মনে লাগে রঙের ছোঁয়া। বাঙালির ভালোবাসা শাশ্বত চিরন্তন- তাইতো প্রথম দিন পহেলা ফাল্গুন ভালোবাসার ঋতু বসন্ত বরণ এবং পরের দিনই ভালোবাসা দিবস পরপর প্রেমময় দু’টি বর্ণিল সুখময় দিন যা একমাত্র বাংলাদেশ তথা বাংলা ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি!
উত্তপ্ত জ্বলে উঠা এই রক্তিম বসন্তেই ‘ধূমকেতু’ প্রকাশের কারণে দেশদ্রোহের অভিযোগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কারাগারে আটক হন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম- যার ফলে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বসন্ত’ নামক গ্রন্থটি নজরুলকে উৎসর্গ করে তাঁর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। “রোদনভরা এ বসন্ত সখী, কখনো আসে নি বুঝি আগে।/মোর বিরহবেদনা রাঙালো কিংশুকরক্তিমরাগে।।”-হ্যাঁ, এরকম রোদনভরা অগ্নিঝরা ফাল্গুনি-চৈতালি অন্যরকম বসন্তও বাংলাদেশে একবার একাত্তরে এসেছিলো- কিন্তু আমরা সেটা ত্রিশ লক্ষ শহীদের তাজা লাল রক্তের বিনিময়ে বিজয়ের বেশে কাটিয়ে উঠেছি- এরকম রোদনভরা এবং জ্বলে উঠা উত্তপ্ত রক্তিম বসন্ত যেন বাংলায় আর না আসে। বসন্ত ঋতুর সাথে বাঙালির আবেগ জড়িত- এই আবেগ মিশ্রিত বসন্তেই মায়ের ভাষা বাংলাকে অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদে সেদিন জ্বলে উঠেছিল আমার দুঃখিনী বর্ণমালা। এই বসন্তেই গাঢ় সবুজের মধ্যে রক্তিম সূর্য সম্বলিত বাংলাদেশের স্বর্ণালি মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের নতুন পতাকা উড়ানো হয়। এই ফাল্গুনি বসন্তেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে/ ঘ্রাণে পাগল করে” গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং পরবর্তীতে তা পৃথিবীর সবচেয়ে মধুরতম জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই ঝঞ্ছা-বিক্ষুব্ধ বসন্তেই বজ্রকন্ঠে বাংলার স্বাধীনতার বাণী ঘোষিত হয়েছিল। এই উত্তাল বসন্তেই জ্বলে উঠেছিল বিক্ষুব্ধ বর্ণমালার চার অক্ষরের একটি অতি প্রিয় শব্দ ‘স্বা-ধী-ন-তা’। অগ্নিঝরা রক্তঝরা উত্তাল অগ্নিগর্ভ এই রক্তিম বসন্তেই বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছিল। যাঁর জন্ম না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না, আমরা একটি নতুন পতাকা পেতাম না, একটি মানচিত্র পেতাম না, একটি জাতীয় সঙ্গীত পেতাম না- এমনকি আজ বসন্ত উৎসবও হতো না- এই ঋতুরাজ বসন্তেই সেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, শতাব্দীর মহাপুরুষ বাংলার অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই রোদনভরা চৈতালি বসন্তেই মুক্তিযুদ্ধে বিপদের বন্ধু সহযোদ্ধা মিত্রবাহিনীকে আমরা অশ্রুসিক্ত নয়নে ‘যেতে নাহি দিব’ বলে বিদায় জানিয়েছিলাম। আবার দেখা হবে নবফাল্গুনে- “এবার বিদায়বেলার সুর ধরো ও চাঁপা ও করবী।/ তোমার শেষ ফুলে আজ সাজি ভরো।।”

(ভিডিও কৃতজ্ঞতায়: Rain Coat; রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী- রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও সাদি মোহাম্মদ)

 

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা; ২ নং সেক্টর, বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

0 Comments

Leave a Comment

বিজ্ঞাপন

পাঠকের মন্তব্য

বিজ্ঞাপন

লক্ষ্য করুন

প্রবাসের আরো খবর কিংবা অন্য যে কোন খবর অথবা লেখালেখি ইত্যাদি খুঁজতে উপরে মেনুতে গিয়ে আপনার কাংখিত অংশে ক্লিক করুন। অথবা ‌উপরেরর মেনু'র সর্বডানে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন এবং আপনার খবর বা লেখার হেডিং এর একটি শব্দ ইউনিকোড ফন্টে টাইপ করে সার্চ আইকনে ক্লিক করুন।
ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন